দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে গবেষণার জন্য প্রাথমিকভাবে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত তহবিল বরাদ্দ করছে বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিল (বিইপিআরসি)। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে গিয়ে যে কেউ যেকোনো সময় তাদের গবেষণা প্রস্তাব জমা দিতে পারবেন। যাচাই-বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হলে গবেষণার জন্য নির্ধারিত অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহযোগিতাও প্রদান করছে বিইপিআরসি। গতকাল সোমবার ঢাকার আইইবি ভবনে অবস্থিত বিইপিআরসির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য জানান প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা গবেষণার জন্য তহবিল প্রদানের অপেক্ষায় রয়েছি। যে কেউ আমাদের কাছে গবেষণা প্রস্তাব জমা দিতে পারেন। এই আবেদন একটি নির্দিষ্ট বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়। এ জন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি জুরি প্যানেল রয়েছে, যারা নিরপেক্ষভাবে প্রস্তাবগুলো মূল্যায়ন করেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কেবল গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নই। উদ্ভাবনকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়েও কাজ করছি। বুয়েটের তৈরি ইজিবাইক প্রকল্পে আমরা অর্থায়ন করেছি। আমরা চাই প্রায়োগিক গবেষণা অব্যাহত থাকুক। যদি কোথাও কোনো উদ্ভাবন থাকে, তা আমাদের নজরে আনার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
বিইপিআরসির লক্ষ্য হলো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সমস্যাগুলোর উদ্ভাবনী সমাধান, নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা, গবেষণার স্থান নির্ধারণসহ বিভিন্ন সহযোগিতা প্রদান করা। তবে, প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, বেশিরভাগ গবেষকও এই প্রতিষ্ঠানের নাম জানেন না।
এ বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে ওয়াহিদ হোসেন বলেন, ‘কর্মজীবনে আমি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছি। বিইপিআরসির বয়স ৯ বছর হলেও, এখানে যোগদানের আগে আমি এই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতাম না। জনগণও এটি সম্পর্কে অবগত নয়। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব জনবল বলতে মাত্র দুজন ড্রাইভার রয়েছেন, বাকি সবই চলছে ডেপুটেশনের মাধ্যমে। ডেপুটেশনে থাকা কর্মকর্তারা একসময় তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে চলে যান। তাই নিজস্ব জনবল গঠন অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের শিল্প সরকারের ওপর নির্ভরশীল। গবেষণা ও উন্নয়ন নিয়ে তাদের তেমন চিন্তা নেই বলে মনে হয়। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। চীন গবেষণা ও উন্নয়নে অনেক এগিয়ে গেছে। আমাদের কৃষিবিদরা বিপ্লব ঘটিয়েছেন, কিন্তু অন্য কোনো খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।’
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) গবেষণার জন্য ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত তহবিল দিয়ে থাকে, যা দিয়ে গবেষণা সম্ভব নয়, বড়জোর স্টাডি পেপার তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এই সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হবে। আমরা গবেষণা ও গবেষকবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে চাই। একাডেমিয়া ও শিল্পের মধ্যে সেতুবন্ধন গঠনের কাজ করছি।’
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে বিইপিআরসির সদস্য (উদ্যোক্তা উন্নয়ন) ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পত্রিকায় দেখেছি, জামালপুরের একজন তরুণ প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি তেল তৈরি করছেন। আমরা তাকে ডেকে কথা বলেছি এবং তার কাজকে কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেছি। ইতিমধ্যে তাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি জানান, দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১৩টি গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি সম্পন্ন হয়েছে এবং ৪টি চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ইউনিট-ভিত্তিক সমস্যার স্থানীয় সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। যে কেউ যেকোনো সময় তাদের প্রস্তাব জমা দিতে পারবেন। এর জন্য কোনো সময়সীমা নেই।’
বিইপিআরসির গবেষণা কার্যক্রম তুলে ধরে পরিচালক (উদ্ভাবন) প্রকৌশলী হাছান মাহমুদ বলেন, ‘মানব বর্জ্য থেকে গ্যাসোলিন, ডিজেল ও এভিয়েশন ফুয়েল উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা দেখছি। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা আয়ের সুযোগ রয়েছে।’ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) প্রধান প্রকৌশলী গোবিন্দ চন্দ্র লাহা বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রতি বছর ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার এয়ার ফিল্টার আমদানি করা হয়। এই পরিবহন খরচের অর্থ বিনিয়োগ করে এয়ার ফিল্টার উৎপাদন কারখানা স্থাপন করা সম্ভব। অথচ আমরা বছরের পর বছর আমদানি করে চলেছি। এমন আরও অনেক বিষয় রয়েছে।’