আবুল বারকাতের জামিন হয়নি, ২ দিনের রিমান্ডে

২৯৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের মামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাতকে জামিন দেয়নি আদালত। গতকাল বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ জাকির হোসেন জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে আদেশ দেন। এ মামলায় আবুল বারকাতকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন শুনানির জন্য ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নথিও পাঠানো হয়েছে।

শুনানিকালে দেশে দুর্নীতির বিস্তার, বিচার ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ভূমিকা উল্লেখ করে বিচারক বলেন, ‘দুদক যেসব মামলা করে, তাতে শাস্তি কম হয়। দুর্নীতির লাগাম টানতে সাজা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।’

গতকাল বিকেলে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন এক আদেশে আবুল বারকাতের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

‘অ্যাননটেক্স গ্রুপ’কে ঋণ পাইয়ে দিয়ে ২৯৭ কোটি ৩৮ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৬ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত ২০ ফেব্রুয়ারি আবুল বারকাতসহ ২৩ জনের নামে মামলা করে দুদক। অভিযোগে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান ও আবুল বারকাত পরস্পর যোগসাজশে  জালিয়াতির মাধ্যমে অ্যাননটেক্স গ্রুপের ২২টি প্রতিষ্ঠানকে এ পরিমাণ টাকা ঋণ দিয়েছেন। আতিউর রহমান ও তার সহযোগী অন্য ব্যক্তিরা বিভিন্ন অনৈতিক কৌশলে এ অর্থ আত্মসাৎ করেন। গত ১০ জুলাই রাতে রাজধানীর ধানম-ির বাসা থেকে আবুল বারকাতকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরদিন তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায় আদালত।

গতকাল বেলা ১১টার কিছু সময় পর আবুল বারকাতকে আদালতে হাজির করা হয়। সে সময় তাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। তার পক্ষে জামিন চেয়ে শুনানি করেন আইনজীবী মো. শাহিনুর ইসলাম। শুনানিতে আইনজীবী বলেন, ‘২০১৩ সালে অ্যাননটেক্স গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সুপ্রভা স্পিনিং মিলস ঋণের আবেদনের পর যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ব্যাংকের বোর্ড সভায় উপস্থাপন করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণ করে ঋণ মঞ্জুর করা হয়। দায়িত্ব পালনে আবুল বারকাত কোনো অবহেলা করেননি।’

অ্যাডভোকেট শাহিনুর আরও বলেন, ‘এর আগে এ বিষয়ে দুদক অনুসন্ধান করে দুর্নীতি হয়নি মর্মে প্রতিবেদন দিয়েছিল। তাই আসামির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা ভিত্তিহীন।’ জামিনের বিরোধিতা করে দুদকের কৌঁসুলি মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর বলেন, ‘যেহেতু তিনি (আবুল বারকাত) জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন, তাই ওনার অধীনস্থরা কোনো অনিয়ম করলে দায় তাকেই নিতে হবে।’

একপর্যায়ে আদালত আবুল বারকাতের বক্তব্য জানতে চায়। আবুল বারকাত বলেন, ‘জীবনে এই প্রথম এভাবে আদালতে দাঁড়াতে হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪২ বছর শিক্ষকতা করেছি। ঘটনাচক্রে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হয়েছি। ২০১৩ সালে আমার সময়ে জনতা ব্যাংকের সর্বোচ্চ প্রফিট হয়েছে, সর্বোচ্চ গ্রোথ হয়েছে। এখন বলা হচ্ছে আমি জনতা ব্যাংককে ডুবিয়েছি, সর্বনাশ করেছি। জেনেশুনে আমি কিছু করিনি। দায়িত্ব পালন নিয়ে যত কথা বলা হচ্ছে, ঋণের বিষয়ে যা বলা হচ্ছে, আমি সে বিষয়ে কিছুই জানি না। ব্যাংকে যারা ছিলেন, তাদের নাম শুনেছি। তাদের চিনি না।’

বিচারক জাকির হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ৫, ১০, ২০ ও ৫০ হাজার কোটি টাকা লোপাট হতে থাকে। এসব টাকা পাচার হয়ে যায়। দুদকের পক্ষে এত এত দুর্নীতি বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’

বিচারক আরও বলেন, ‘আগে দুর্নীতি হতো ৫০ কোটি টাকার, এখন দুর্নীতি হচ্ছে ৫ হাজার কোটি টাকার। কিন্তু সাজা হয় পাঁচ বছর। দুর্নীতির লাগাম টানতে মামলার সাজা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। না হলে দুর্নীতি কমানো সম্ভব হবে না।’

আবুল বারকাতের উদ্দেশে বিচারক বলেন, ‘আপনার সময়ে জনতা ব্যাংক সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে ছিল। সোনালী ব্যাংকের অবস্থাও ভালো ছিল না। দুর্নীতির মাধ্যমে লোন পাস করিয়ে ব্যাংকের অবস্থা আরও খারাপ করা হয়েছে। ব্যাংকের বোর্ডের সহায়তায় বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে। এটা নজিরবিহীন। দেশের অর্থনীতির মেরুদ- ভেঙে গেছে।’