বহুল আলোচিত ‘সরকারি চাকরি (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে সরকার। গতকাল বুধবার রাতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে গেজেট জারির বিষয়টি জানানো হয়েছে। দ্বিতীয় সংশোধিত অধ্যাদেশে বেশ কিছু পরিমার্জন করে তিন ধরনের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া শাস্তি নিশ্চিতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন, চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরের দণ্ড যুক্ত করা হয়েছে।
গত ২৫ মে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধের জন্য বিভাগীয় মামলা ছাড়াই শুধু কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়ে চাকরিচ্যুত করার বিধান রেখে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল সরকার। তবে এ অধ্যাদেশ জারির আগে থেকেই সচিবালয়ের অভ্যন্তরে ও বাইরে আন্দোলন করে আসছিলেন সরকারি কর্মচারীরা। অধ্যাদেশটিকে ‘কালো আইন’ আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবি জানান তারা। তাদের এ আন্দোলন চলে এক মাসের বেশি সময়। একপর্যায়ে অধ্যাদেশটি পর্যালোচনা করে সুপারিশ করতে আইন উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গত ৩ জুলাই ‘সরকারি চাকরি (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এর ধারাবাহিকতায় অধ্যাদেশের গেজেট জারি হলো।
সংশোধিত অধ্যাদেশে ‘সরকারি কর্মচারীদের আচরণ ও দণ্ড সংক্রান্ত বিশেষ বিধান’-এ বলা হয়েছে, ‘আইনের অধীন প্রণীত বিধিমালায় যা কিছুই থাকুক না কেন, যদি কোনো সরকারি কর্মচারী ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করেন, আইনসংগত কারণ ছাড়া সরকারের কোনো আদেশ, পরিপত্র এবং নির্দেশ অমান্য করেন বা এর বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করেন বা এসব কাজে অন্য কোনো সরকারি কর্মচারীকে প্ররোচিত করেন বা ছুটি বা যুক্তিসংগত কোনো কারণ ছাড়া অন্যান্য কর্মচারীর সঙ্গে সমবেতভাবে নিজ কর্মে অনুপস্থিত থাকেন বা বিরত থাকেন বা যেকোনো সরকারি কর্মচারীকে তার কর্মে উপস্থিত হতে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধাগ্রস্ত করেন তাহলে এটা হবে সরকারি কর্মে বিঘœ সৃষ্টিকারী অসদাচরণ।’
এজন্য তিন ধরনের শাস্তির কথা বলা হয়েছে অধ্যাদেশে। এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীকে নিম্নপদ বা নিম্নবেতন গ্রেডে অবনমিতকর, বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যাবে।
আগের অধ্যাদেশে ‘সরকারি কোনো কর্মচারী যদি এমন কোনো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন, যার কারণে অন্য যেকোনো সরকারি কর্মচারীর মধ্যে অনানুগত্য সৃষ্টি করে বা শৃঙ্খলা বিঘিœত করে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধার সৃষ্টি করে’ এমন বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে সংশোধিত অধ্যাদেশে।
নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর অভিযোগ গঠন করে সাত কার্যদিবসের মধ্যে অভিযুক্তকে নোটিস দেওয়া হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নিতে ইচ্ছুক কি না, নোটিসে তাও জানতে চাওয়া হবে। এ ছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তি নোটিসের জবাব দিলে অথবা জবাব না দিলেও নিয়োগকারী কর্র্তৃপক্ষ বা অভিযোগ গঠনকারী ব্যক্তি তিন দিনের মধ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবে। কমিটির সদস্যদের অভিযুক্ত ব্যক্তির থেকে কর্মে জ্যেষ্ঠ হতে হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি নারী হলে তদন্ত কমিটিতে আবশ্যিকভাবে একজন নারী সদস্যকে রাখতে হবে। তদন্তের আদেশ পাওয়ার পরবর্তী ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। যুক্তিসংগত কারণে এই সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারলে সর্বোচ্চ একবারের জন্য সাত কার্যদিবস সময় বাড়ানো যাবে। তদন্ত কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে না পারলে তা তাদের অদক্ষতা হিসেবে বিবেচিত করা হবে।
সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, অভিযুক্তকে তদন্ত প্রতিবেদনের কপি দেওয়া হবে। দণ্ড আরোপের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযুক্ত আপিল করতে পারবেন। আপিল কর্র্তৃপক্ষ চাইলে দণ্ড বহাল বা বাতিল করতে পারবেন। তবে রাষ্ট্রপতির আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রাখা হয়নি। রাষ্ট্রপতির আদেশের ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে।