পাট নিয়ে দুশ্চিন্তায় চাষিরা

পাটের রাজধানী খ্যাত ফরিদপুর জেলার চাষিরা এ বছর পাট চাষ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। অতিবৃষ্টির কারণে নিম্নাঞ্চলের জমিতে পানি জমে থাকায় পাটের গোড়ায় পচন ধরেছে, ফলে চাষিদের অপরিপক্ব পাট কাটতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচের তুলনায় লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন তারা। অন্যদিকে, ভালো ফলন হওয়া এলাকাগুলোতে পানির অভাবে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে শঙ্কিত কৃষকরা। যদিও এ বছর পাটের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে, তবু চাষিদের মুখে হাসি নেই।

দেশের পাট উৎপাদনের সিংহভাগ আসে ফরিদপুর থেকে। তবে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, পাটের ন্যায্য দাম না পাওয়া এবং পাট পচানোর জটিলতার কারণে চাষিরা সবসময় দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, ফরিদপুরের মাটি ও আবহাওয়া পাট চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ কারণে এ বছর ৮৫ হাজার ৫২৬ হেক্টর জমির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৮৬ হাজার ৫৩১ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগ বাম্পার ফলনের আশা করলেও, নগরকান্দা, ভাঙ্গা ও সদরপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের জমিতে অতিবৃষ্টির কারণে পাটের গোড়ায় পচন ধরায় চাষিরা আগাম পাট কাটতে বাধ্য হচ্ছেন, যা লোকসানের কারণ হতে পারে। এছাড়া, পাট জাগ দেওয়ার জন্য খাল-বিলে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় চাষিরা উদ্বিগ্ন।

ফরিদপুরের সোনালি আঁশ শুধু জেলার পরিচিতি নয়, কৃষকদের জীবন-জীবিকার প্রতীকও। সঠিক নীতি ও সরকারি সহায়তা পেলে এই ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে জানা গেছে, এ বছর সামগ্রিকভাবে পাটের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, কিছু নিম্নাঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় পাটের চারা প্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পায়নি। ফলে অপরিপক্ব পাট কাটতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা, যা তাদের আর্থিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। তবে, কৃষি বিভাগ জানায়, জেলার অধিকাংশ এলাকায় পাটের ফলন ভালো হয়েছে, যা কৃষকদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। 

চাষিরা জানান, পাটের ন্যায্য দাম নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। বীজ, জৈব ও রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, ফলে লাভের সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে। তারা সরকারের কাছে ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা এবং বীজ, সার ও কীটনাশকের দাম কমানোর দাবি জানিয়েছেন।

সালথা উপজেলার গট্টি গ্রামের চাষি হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এ বছর পাট চাষে প্রতিবিঘা জমিতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন ভালো হয়েছে, তবে বাজারে ভালো দাম পেলে লাভবান হতে পারব।’ একই উপজেলার ভাওয়াল গ্রামের ফরিদ মোল্লা বলেন, ‘বীজ, সার, ওষুধ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। খাল-বিল, নদী-নালা ও পুকুরে পানির অভাবে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে সমস্যায় আছি। ভালো পানি না পেলে পাটের রঙ নষ্ট হয়, ফলে সোনালি আঁশের দাম কমে যায়।’

বোয়ালমারী উপজেলার বাইখীর গ্রামের চাষি সুইট ম-ল বলেন, ‘সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও ন্যায্য দাম নিশ্চিত হলে পাট চাষের সম্ভাবনা আরও বাড়বে। চাষিদের পাশে দাঁড়ালে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।’

বাংলাদেশ পাটচাষি কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. হারুনুর রশিদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা পাটচাষিদের কল্যাণে আন্দোলন করে যাচ্ছি, কিন্তু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। সরকারি সহযোগিতা ও মিল মালিকদের কাছ থেকে পাওনা টাকা ফেরত পেলে চাষিরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। নইলে সোনালি আঁশ চাষিদের জন্য গলার ফাঁস হয়ে উঠবে।’

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, ‘ফরিদপুর সবসময় পাট উৎপাদনে শীর্ষে থাকে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৮৬ হাজার ৫৩১ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। আমরা ২ লাখ ১৬ হাজার ১৬১ টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছি, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। বাম্পার ফলনের আশা করছি।’