দেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) চিকিৎসকরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য উল্লেখ করে তারা জানান, বেসরকারি হিসেবে হেপাটাইটিসে দেশে প্রতি বছর ২০ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। ১০ জনের ৯ জনই জানেন না তারা হেপাটাইটিসে আক্রান্ত।
গতকাল সোমবার বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উদযাপন উপলক্ষে বিএমইউতে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে এই তথ্য জানানো হয়। চিকিৎসকরা রোগটি প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হতেও এই রোগ নির্মূলে একযোগে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন।
সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হেপাটলজিস্ট অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, ব্যবসায়িক স্বার্থ বা করপোরেট প্রভাবে নয়, রোগীদের স্বার্থে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে প্রয়োগ করতে হবে। হেপাটাইটিস নিয়ে কুসংস্কার, বৈষম্য আছে তা দূর করতে হবে। রোগীদের কোনোভাবেই চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। গাইডলাইন অনুসরণ করে প্রেসক্রিপশন লেখাসহ রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। সমানভাবে কার্যকরী হলে কমদামি ওষুধটাই লিখতে হবে। এদেশে প্রচুর রোগী, তাই গবেষণার সুযোগও বেশি, এই সুযোগ অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে।
সেমিনারে জানানো হয়, বিশ্বে প্রতি বছর হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১৪ লাখ বা ১ দশমিক ৪ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়। সে হিসেবে রোগটিতে প্রতি সেকেন্ডে মারা যাচ্ছে ১ জন।
সেমিনারে হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসের প্রভাব তুলে ধরে চিকিৎসকরা জানান, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ এই দুই ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণে আক্রান্ত। বিশ্বব্যাপী লিভার ক্যানসারের প্রধান কারণ হেপাটাইটিস বি ও সি। লিভার ক্যানসারে ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে দায়ী এই দুইটি ভাইরাস। ভাইরাল হেপাটাইটিস একটি গুরুতর রোগ যা লিভারের প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সেমিনারে আরও বলা হয়, হেপাটাইটিস রোগের সহজেই পরীক্ষা, প্রতিষেধক ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক বাধাগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। কারণ সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসার অভাবে প্রতিদিনই বাড়ছে এই নীরব ঘাতকের ভয়াল থাবা।
চিকিৎসকরা আরও জানান, দেশে আনুমানিক ৫-৭ শতাংশ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসে আক্রান্ত। গ্রামীণ জনপদ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় সচেতনতার অভাব, নিরাপদ রক্ত সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা-ব্যবস্থার অভাবে সংক্রমণ আরও বাড়ছে।
সেমিনারে জানানো হয়, বিএমইউ এই প্রথমবারের মতো দেশের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, হেপাটোলজি, হেপাটোবিলিয়ারি ও পেডিয়াট্রিক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটিসহ সংশ্লিষ্ট সব সংগঠনকে একত্র করে হেপাটাইটিস মোকাবিলায় সম্মিলিত পদক্ষেপ নিয়েছে।
সেমিনারের বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে বলা হয়, হেপাটাইটিস মানে লিভারে প্রদাহ। সাধারণত ভাইরাসজনিত সংক্রমণের মাধ্যমে এটি হয়ে থাকে। এই রোগের পাঁচটি প্রধান ধরন এ,বি,সি,ডি এবং ই। এর মধ্যে বি এবং সি ভাইরাস দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণের কারণে সবচেয়ে বিপজ্জনক। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এর ফল হতে পারে লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিওর এবং এমনকি লিভার ক্যানসার। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে হেপাটাইটিসের কোনো উপসর্গ থাকে না। ফলে রোগীরা বুঝতেই পারেন না যে তারা আক্রান্ত। তাই হেপাটাইটিসকে ‘সাইলেন্ট কিলার’ বলা হয়।
রোগটি প্রতিরোধে চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়ে বলেন, হেপাটাইটিস প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, বিশুদ্ধ খাবার গ্রহণ, হাত ধোয়া, নিরাপদ রক্তদান ও গ্রহণ, জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ব্যবহার, হেপাটাইটিস এ এবং বি এর টিকা নেওয়া, হেপাটাইটিস বি ও সি এর পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। কারণ মা আক্রান্ত হলে সন্তানের শরীরেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। গর্ভাবস্থায় সঠিক চিকিৎসা ও জন্মের সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাকে টিকা দিলে সংক্রমণ ঝুঁকি ৯০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে কমানো সম্ভব। নিরাপদ স্বাস্থ্যচর্চা যেমন ইনজেকশন, দাঁতের চিকিৎসা, ব্লেড, কানের ছিদ্র এবং রক্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
সেমিনারে তিনটি বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম আযম, অধ্যাপক ডা. মো. রুকনুজ্জামান, অধ্যাপক ডা. মো. মোহছেন চৌধুরী, অধ্যাপক ডা. বিধান চন্দ্র দাস, ডা. লুবানা আকরাম, ডা. এবিএম সফিউল্লাহ, ডা. মো. জাহিদুর রহমান, ডা. শারমিন সুলতানা, ডা. আরিফা তাসনিম প্রমুখ চিকিৎসক রোগটি সম্পর্কে এসব তথ্য তুলে ধরেন।