সন্তানের মৃত্যুতে ধৈর্যধারণের পুরস্কার

মানবজীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলোর একটি হলো সন্তানের মৃত্যু। এই শোক এমন এক ব্যথা, যা শুধু সেই মা-বাবাই বুঝতে পারেন, যারা এই কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন। ইসলামে এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনার প্রতিও এক গভীর দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আল্লাহতায়ালা কোরআন-হাদিসে এ ধরনের দুঃখ-কষ্টে ধৈর্যধারণকারীদের জন্য অসীম পুরস্কার ও মর্যাদার ঘোষণা দিয়েছেন। শিশুর মৃত্যু কোনো শাস্তি নয়, বরং এক কঠিন পরীক্ষা, যেটায় উত্তীর্ণ হলে মা-বাবা পেতে পারেন জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদা।

কোরআনের বর্ণনা : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর অবশ্যই আমি তোমাদেরকে ভয় ও ক্ষুধা দ্বারা এবং ধন-সম্পদ, জান-মাল ও ফল-ফসলের কিছু ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা ১৫৫) এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, জানমালের ক্ষতি জীবনের একটি বাস্তবতা এবং তা পরীক্ষাস্বরূপ আসে। সন্তানের মৃত্যু নিঃসন্দেহে জানের ক্ষতি, যা সবচেয়ে হৃদয়বিদারক। কিন্তু যারা এ পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করেন, আল্লাহ তাদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন।

হাদিসের বর্ণনা : শিশুর মৃত্যুর ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বহু হাদিস পাওয়া যায়, যেখানে মা-বাবার জন্য সান্ত্বনা, ধৈর্যের উপদেশ ও পরকালে পুরস্কারের সুসংবাদ রয়েছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাদিস তুলে

ধরা হলো।

জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মুসলমানের তিনটি সন্তান মারা যায়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবধারিত করে দেন।’ (সহিহ বুখারি) অন্য এক বর্ণনায় আছে, সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! যদি দুটি সন্তান হয়? তিনি বলেন, হ্যাঁ, যদি দুটি সন্তানও হয়।’ (সহিহ বুখারি)

ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি : সন্তান হারানোর বেদনায় ধৈর্য ধরতে পারা সহজ নয়, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এটা অপরিহার্য। কোরআনে বারবার ধৈর্যশীলদের প্রশংসা করা হয়েছে এবং জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই।’ (সুরা জুমার ১০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আসলে ধৈর্য হচ্ছে সেই সময়, যখন প্রথম ধাক্কাটা লাগে।’ (সহিহ বুখারি) এই হাদিস আমাদের শেখায়, শিশুর মৃত্যু বা যেকোনো বড় বেদনায় প্রথম ধাক্কায় যদি আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ধৈর্য ধরে থাকি, সেটাই প্রকৃত ধৈর্য।

পরকালীন কল্যাণের কারণ : শিশুসন্তানের মৃত্যু কখনোই বৃথা নয়। ছোট শিশু পাপমুক্ত অবস্থায় মারা যায় এবং সে জান্নাতের বাসিন্দা হয়। এ শিশুরা জান্নাতে প্রবেশ করে এবং মা-বাবার জন্য দোয়া ও সুপারিশ করে। একটি হাদিসে আছে, ‘ছোট ছোট শিশুরা কেয়ামতের দিনে জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে এবং আল্লাহর অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না তাদের মা-বাবাও তাদের সঙ্গে প্রবেশ করে।’ (সহিহ মুসলিম)

অফুরন্ত পুরস্কারের বার্তা : শিশুর মৃত্যু নিঃসন্দেহে এক কঠিন শোক ও জীবনের চরম পরীক্ষা। তবে ইসলাম এই শোককে শুধু দুঃখের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং এই শোকের মধ্যেও মা-বাবার জন্য অফুরন্ত পুরস্কারের বার্তা দিয়েছে। যারা ধৈর্য ও ইমানের সঙ্গে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেন এবং তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।

আসুন, আমরা সবাই জীবন ও মৃত্যু উভয়টিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত পরীক্ষার অংশ হিসেবে মেনে নেই এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখি। নিশ্চয় তিনি আমাদের জন্য উত্তম প্রতিদান সংরক্ষণ করে রেখেছেন।