১২ কোটি টাকার গাড়ি ৫ লাখে!

এমপি কোটায় আনা ৩০ গাড়ি (ল্যান্ড ক্রুজার) নিয়ে বিপাকে কাস্টমস। বিলাসবহুল যে গাড়ির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১২ কোটি টাকা, নিলামে সেই গাড়ির দাম উঠেছে এক থেকে পাঁচ লাখ টাকা। নিলাম আইনে দ্বিতীয় নিলামে প্রথম দামের চেয়ে বেশি দাম পেলেই এসব গাড়ি বরাদ্দ দিয়ে দিতে হবে। তাই দ্বিতীয় নিলাম না ডেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে চিঠি লিখেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস।

চিঠি লেখার কথা স্বীকার করে কাস্টমসের নিলাম শাখার সহকারী কমিশনার সাকিব হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি গাড়ি নিয়ে রিট মামলা থাকায় ৩১টি গাড়ির মধ্যে ৩০টি গাড়ির প্রথম নিলাম হয়েছে গত এপ্রিল-মে মাসে। কিন্তু নিলামে ৯টি গাড়ির কোনো বিড পড়েনি। বাকি গাড়িগুলোর দাম উঠেছে মাত্র ১ লাখ থেকে ৫ লাখ পর্যন্ত। এর মধ্যে শুধুমাত্র একটি গাড়ির সর্বোচ্চ দাম উঠেছে ৩ কোটি ১০ লাখ।’

প্রথম নিলামে এসব গাড়ি বিক্রি করেননি কেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিলাম আইন অনুসারে ভিত্তি মূল্যের ৬০ শতাংশ দাম পেলের বিক্রি করা যাবে। এমপি কোটায় আনা গাড়িগুলোর ভিত্তিমূল্য ছিল ৯ কোটি ৬৭ লাখ। এর ৬০ শতাংশ দাম হয় ৫ কোটি ৮০ লাখ। এর নিচে হলে বিক্রি করা যায় না। তাই আমরা এসব গাড়ি বিক্রি করিনি। কিন্তু আইন অনুসারে দ্বিতীয় নিলামে প্রথম নিলামের চেয়ে বেশি হলেই তা বিক্রি করে দিতে বাধ্য। সে হিসেবে যে গাড়ির দাম প্রথম নিলামে এক লাখ উঠেছে এখন যদি দ্বিতীয় নিলামে কেউ এক লাখ ১০ হাজার টাকা দর দেয় তাহলে তা বিক্রি করে দিতে হবে। কিন্তু বিলাসবহুল এসব নতুন গাড়ি কি এই দামে বিক্রি করা সম্ভব?

তিনি আরও বলেন, তা সম্ভব না বলে এসব গাড়ির ক্ষেত্রে নির্দেশনা চেয়ে আমরা গত জুনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে চিঠি লিখেছি। এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যে নির্দেশনা দেবে আমরা তা কার্যকর করব।

কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম কাস্টমসের চিঠি পেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড একটি চিঠি দিয়েছে। সেই চিঠি পাওয়ার পর কাস্টমস, বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) ও বিভিন্ন সেক্টরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সদস্য সচিব হলেন কাস্টমসের সহকারী কমিশনার আফরিন জাহান নওমিন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আফরিন জাহান নওমিন বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে কমিটির একটি মিটিং করেছি। আরও একটা মিটিং করতে হবে। সেই মিটিং থেকে এমপি কোটায় আনা গাড়িগুলো নিয়ে কী করা যায় এবং কীভাবে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে একটি সুপারিশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে পাঠানো হবে। সেই সুপারিশের আলোকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গাড়িগুলোর বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দেবে।’

এদিকে এমপি কোটায় আনা বিলাসবহুল গাড়িগুলো থেকে ৫টি গাড়ি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কিনতে আগ্রহী। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ কোন দামে কিংবা কোন প্রক্রিয়ায়  নেবে? নিলামের মাধ্যমে বন্দর কর্তৃপক্ষ পেতেও পারে আবার নাও পেতে পারে। এক্ষেত্রে উপায় কী? এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কাস্টমসের নিলাম শাখার সহকারী কমিশনার সাকিব হাসান বলেন, ‘প্রথমত বন্দর কর্তৃপক্ষের কোনো চিঠি আমরা পাইনি। এক্ষেত্রে এসব গাড়ির বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যে সিদ্ধান্ত দেবে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষকে যে মূল্যে দিতে বলবে আমরা সেই মূল্যে তাদের দেব। কিন্তু নির্দেশনা দেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, আমরা এখনো ৫টি গাড়ি নিতে চাই। আমরা ইতিমধ্যে নৌ-মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। সেই চিঠি বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে রয়েছে।

তবে এমপি কোটায় আনা এসব গাড়ি বিদ্যমান নিলাম আইনে দ্বিতীয় নিলামে না গেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিশেষ আদেশ প্রয়োজন হবে বলে জানান কাস্টমস বিডার (নিলাম ডাকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন) অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব চৌধুরী। তিনি বলেন, সরকার চাইলে এসব গাড়ি এখন কোনো সংস্থাকে বরাদ্দ দিতে পারবে না। যেহেতু এগুলো নিলামের জন্য ক্যাটালগভুক্ত হয়েছে এবং প্রথম নিলামে তোলা হয়েছে তাই দ্বিতীয় নিলামে তুলতে হবে। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিশেষ নির্দেশনায় ভিত্তিমূল্যের ৬০ শতাংশ হারে সরকারের অন্য কোনো সংস্থার কাছে বিক্রি করতে পারবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টাস অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বলেন, এমপি সুবিধায় আনা এসব গাড়ি নিলামের মাধ্যমে সরকারের চাহিদা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হবে না। এসব দামি গাড়িগুলো নিলাম প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই রেয়াত কমিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরকারের কোনো সংস্থাকে দেওয়া যায় কি না তা বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে অন্ততপক্ষে গাড়িগুলো ব্যবহারের মধ্যে থাকবে এবং নষ্ট হবে না।

উল্লেখ্য, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের এমপি কোটার সুবিধা নিয়ে ৫০ জন এমপি শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির অনুমতি পান। জাপান থেকে আমদানি করা এসব গাড়ির বাজারমূল্য ১২  থেকে ১৫ কোটি টাকা। কিন্তু দ্বাদশ সংসদের সংসদ সদস্যরা বিনাশুল্কে ১ থেকে দেড়  কোটি টাকায় আমদানি করেছিলেন এসব গাড়ি। আমদানিকৃত মূল্যের ওপর সরকারের শুল্ক বিবেচনায় এনে এসব গাড়ির ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯ কোটি ৬৭ লাখ। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে বিগত সরকারের পতনের পর এমপিরা পালিয়ে যাওয়ায় এসব গাড়ি ডেলিভারি নিতে পারেনি। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান, ব্যারিস্টার সুমন, নায়ক ফেরদৌসহ আটজন গাড়ি খালাস করে নিয়ে যান। প্রথম দফায় ২৪টি ও পরবর্তী সময়ে আরও ৬টি গাড়ির নিলাম হয়েছিল।