বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আদর্শ অনুপাত ধরা হয় ১:২০, অর্থাৎ প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকা উচিত। এই মানদণ্ড মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ফার্মেসি বিভাগে এই অনুপাত ১:৫৭, যা মানসম্মত শিক্ষার জন্য অত্যন্ত অপ্রতুল। বর্তমানে বিভাগে ২৮৭ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। কাগজে-কলমে বিভাগে ১২ জন শিক্ষকের পদ থাকলেও তাদের মধ্যে সাতজন শিক্ষা ছুটিতে রয়েছেন, ফলে শিক্ষক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ফার্মেসি বিভাগে বর্তমানে আটটি ব্যাচে ২৮৭ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। প্রতি সেমিস্টারে ৫ থেকে ৯টি কোর্স এবং ব্যবহারিক (ল্যাব) কোর্স রয়েছে। মাত্র পাঁচজন শিক্ষকের ওপর এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পাঠদান, ল্যাব পরিচালনা এবং পরীক্ষা ও মূল্যায়নের দায়িত্ব থাকায় শিক্ষকরা চরম চাপের মধ্যে রয়েছেন।
এর ফলে শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষা এবং ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে, যা সেশনজটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একজন শিক্ষককে একাধিক ব্যাচের বিভিন্ন কোর্স পরিচালনা করতে হচ্ছে, ফলে পাঠদানের গুণগত মান ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধার অভাবে ব্যবহারিক শিক্ষাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফার্মেসি শিক্ষার জন্য ব্যবহারিক জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, শিক্ষক ও ল্যাব সুবিধার অভাবে শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যারিয়ার গঠনে প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না।
২০১৩ সালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫তম বিভাগ হিসেবে ফার্মেসি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় মাত্র তিনজন শিক্ষক নিয়ে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভাগটি শিক্ষক সংকটে ভুগছে। সর্বশেষ ২০২১ সালের নভেম্বরে দুজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও এর মধ্যে বিদ্যুৎ কুমার সরকার চাকরি ছেড়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছেন। ফলে শিক্ষক সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গাইডলাইন অনুযায়ী, ফার্মেসির মতো বিশেষায়িত বিভাগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:১৫ হওয়া উচিত। তবে কুবির ফার্মেসি বিভাগে এই অনুপাত ১:৫৭, যা শিক্ষার গুণগত মানের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এ ছাড়া বিভাগে পর্যাপ্ত অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং সহকারী অধ্যাপকের পদ শূন্য থাকায় শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষক সংকটের সমাধানে শিক্ষার্থীরা একাধিকবার প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন। গত ১৬ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক সংকট নিরসনের দাবিতে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন। তারা বিভাগে অন্তত পাঁচজন নতুন শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান। পরদিন, ১৭ জুলাই, শিক্ষার্থীরা বিভাগের সব শ্রেণিকক্ষে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন। ২০ জুলাই বিজ্ঞান অনুষদের সামনে থেকে আরেকটি মিছিল বের করে তারা প্রশাসনের কাছে তাদের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
শিক্ষার্থী সোহানুল ইসলাম বলেন, ‘ফার্মেসি বিভাগে শিক্ষার্থীরা উচ্চাকাক্সক্ষা নিয়ে ভর্তি হয়। কিন্তু শিক্ষক সংকট, ল্যাব সুবিধার অভাব এবং অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর কারণে আমাদের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে। আমরা এই সমস্যার দ্রুত সমাধান চাই।’
আরেক শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হলেও তাদের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। আমরা এই পরিস্থিতির অবসান চাই।’
ফার্মেসি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. প্রদীপ দেবনাথ বলেন, ‘প্রশাসন আমাদের বৃহস্পতিবার (আজ) পর্যন্ত সময় দিয়েছে। তারা আশ্বাস দিয়েছে যে এই সময়ের মধ্যে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে।’
উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলী বলেন, ‘আমরা ইউজিসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এবং ফার্মেসি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের জন্য অনুরোধ জানিয়েছি। তারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছে। আশা করি, শিগগিরই ইউজিসির অনুমোদন পাওয়া যাবে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।’