বাগযুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধের ছায়া

রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভের উসকানিমূলক মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুটি পারমাণবিক সাবমেরিন ‘যথাযথ অঞ্চলে’ মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন। এই পদক্ষেপ স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার কৌশলের প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করেছে এবং বিশ্বব্যাপী উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

বিবিসি বলছে, ট্রাম্প ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করতে রাশিয়াকে ৮ আগস্টের মধ্যে সময়সীমা বেঁধে দেন এবং ব্যর্থ হলে কঠোর শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেন। এর জবাবে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমানে রাশিয়ান ফেডারেশনের নিরাপত্তা পরিষদের উপ-চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ একাধিক উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন। তিনি সোভিয়েত আমলের ‘ডেড হ্যান্ড’ পারমাণবিক কৌশলের উল্লেখ করে বলেন, ‘প্রতিটি নতুন আল্টিমেটাম যুদ্ধের দিকে একটি ধাপ এগিয়ে যাওয়া।’ তিনি ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, ‘রাশিয়া ইসরাইল বা ইরান নয়, এবং এমন আল্টিমেটাম দিয়ে যুদ্ধের দিকে এগোলে এর পরিণতি ভয়াবহ হবে।’

মেদভেদেভের বক্তব্য ক্রেমলিনের আনুষ্ঠানিক নীতির প্রতিফলন কি না তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি ক্রেমলিনের জাতীয়তাবাদী বার্তার একটি চরম সংস্করণ উপস্থাপন করছেন, যা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য বেশি প্রাসঙ্গিক। তবে অন্যরা মনে করেন, এটি রাশিয়ার কৌশলগত বার্তা, যা পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে ভীতি প্রদর্শনের অংশ।

অবশ্য মেদভেদেভের মন্তব্যের জবাবে ট্রাম্প গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ঘোষণা করেন, ‘দিমিত্রি মেদভেদেভের অত্যন্ত উসকানিমূলক বিবৃতির প্রেক্ষাপটে আমি দুটি পারমাণবিক সাবমেরিন যথাযথ অঞ্চলে মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছি।’ তবে তিনি স্পষ্ট করেননি যে এই সাবমেরিনগুলো পারমাণবিক শক্তিচালিত নাকি পারমাণবিক অস্ত্রবাহী, এবং ‘যথাযথ অঞ্চল’ বলতে কোন এলাকাকে বোঝানো হচ্ছে তাও উল্লেখ করেননি।

ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে বিশ্লেষকরা ‘বাগযুদ্ধ’ হিসেবে দেখছেন, যা সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা দেওয়ার জন্য বেশি প্রাসঙ্গিক। যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনগুলো ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন মহাসাগরে টহল দিয়ে থাকে এবং এগুলোর মধ্যে কিছু পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। তবে ট্রাম্পের ঘোষণা এই উত্তেজনার সময়ে রাশিয়ার প্রতি একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে।

ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি পুতিনকে ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য চাপ দিচ্ছেন এবং এই হুমকি তার কৌশলের অংশ। তবে মেদভেদেভের পাল্টা বক্তব্য এবং ট্রাম্পের সাবমেরিন মোতায়েনের নির্দেশ দুই পরাশক্তির মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সাবমেরিন বহরের মালিক। এর মধ্যে ওহাইও-ক্লাস ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিনগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই সাবমেরিনগুলো, যা ‘বুমার’ নামে পরিচিত এবং গোপনে চলাফেরা ও পারমাণবিক অস্ত্র ছোড়ার ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত। দেশটির হাতে বর্তমানে ১৪টি ওহাইও-ক্লাস সাবমেরিন সক্রিয় রয়েছে, যার প্রতিটি ২০টি ট্রাইডেন্ট ডি৫ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো একাধিক পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম, যা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিরক্ষার মূল ভিত্তি। এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের ফাস্ট অ্যাটাক সাবমেরিনগুলোর মধ্যে ভার্জিনিয়া-ক্লাস, সিওউল্ফ-ক্লাস এবং লস অ্যাঞ্জেলেস-ক্লাস উল্লেখযোগ্য। ভার্জিনিয়া-ক্লাস সাবমেরিনগুলো সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত এবং বিশেষ অভিযান, নজরদারি ও দূরপাল্লার আক্রমণে সক্ষম। লস অ্যাঞ্জেলেস-ক্লাস সাবমেরিনগুলো স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত হুমকির মোকাবিলায় তৈরি হয়েছিল এবং এখনো ২৪টি সক্রিয় রয়েছে। এই সাবমেরিনগুলো টমাহক ও হারপুন ক্ষেপণাস্ত্র এবং এমকে-৪৮ টর্পেডো দিয়ে সজ্জিত।

অন্যদিকে রাশিয়ার সাবমেরিন বহরও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী, যার মধ্যে প্রায় ৬৪টি সাবমেরিন রয়েছে। এর মধ্যে বোরেই-ক্লাস সাবমেরিনগুলো রাশিয়ার কৌশলগত প্রতিরক্ষার মূল ভিত্তি। প্রতিটি বোরেই-ক্লাস সাবমেরিন ১৬টি বুলাভা এসএলবিএম এবং ৬টি টর্পেডো লঞ্চার বহন করতে পারে। এ ছাড়া, ডেলটা ৪-ক্লাস সাবমেরিনগুলো এখনো সক্রিয়, যার প্রতিটিতে ১৬টি সিনেভা এসএলবিএম রয়েছে।

রাশিয়ার আক্রমণাত্মক সাবমেরিনগুলোর মধ্যে ইয়াসেন-ক্লাস সবচেয়ে উন্নত। এগুলো দূরপাল্লার ক্যালিবার এবং অনিক্স ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে, যা স্থলভাগ ও সমুদ্রে আক্রমণে কার্যকর। রাশিয়ার সাবমেরিন বহর পানির নিচে শত্রু সাবমেরিন ধ্বংস এবং সমুদ্রতলের মাইন বসানোর ক্ষেত্রেও সক্ষম।

রুশ পার্লামেন্টের শীর্ষ সদস্য ভিক্তর ভোডোলাতস্কি দাবি করেছেন, বিশ্বের মহাসাগরে রাশিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিনের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি। ট্রাম্প যেসব সাবমেরিন মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন, সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার নজরদারিতে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া বিশ্বের পারমাণবিক অস্ত্রের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। উভয় দেশের সাবমেরিন বহর পারমাণবিক ত্রয়ী (জমি, সমুদ্র, এবং বায়ু-ভিত্তিক অস্ত্র) এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ট্রাম্পের সাবমেরিন মোতায়েন এবং মেদভেদেভের ‘ডেড হ্যান্ড’ উল্লেখ পারমাণবিক সংঘাতের সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই উত্তেজনা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে এটি বিশ্বব্যাপী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প ও মেদভেদেভের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে চলমান বাগযুদ্ধ রাজনৈতিক ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা বাড়িয়েছে। মেদভেদেভের মন্তব্য যদি ক্রেমলিনের নীতির প্রতিফলন হয়, তবে এটি রাশিয়ার আগ্রাসী অবস্থানের ইঙ্গিত।

এ ছাড়া ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন নিয়ে ট্রাম্পের হুমকি এবং পুতিনের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ট্রাম্পের সময়সীমা এবং নিষেধাজ্ঞার হুমকি রাশিয়াকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে প্ররোচিত করতে পারে।

উভয় দেশের সাবমেরিন মোতায়েন পারমাণবিক সক্ষমতার প্রদর্শন হিসেবে কাজ করছে। এটি শুধু দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে না, বরং অন্যান্য দেশকেও সতর্ক করে দিচ্ছে।

তবে ট্রাম্পের সাবমেরিন মোতায়েন এবং মেদভেদেভের হুমকির বৈশ্বিক প্রভাব বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের ঘোষণার পর মস্কোর শেয়ার বাজারে দরপতন দেখা গেছে, যা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়। রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক আরোপ হলে তেলের বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে পারে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর চাপ

সৃষ্টি করবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সাবমেরিন মোতায়েনের ফলে উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে পারে। ন্যাটো সদস্যরাষ্ট্রগুলো এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াতে পারে, যা রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ককে আরও টানাপড়েনের দিকে নিয়ে যাবে। এই ঘটনা পারমাণবিক অস্ত্র ও সাবমেরিন প্রযুক্তির প্রতিযোগিতাকে ত্বরান্বিত করতে পারে। চীন, ভারত, এবং অন্যান্য দেশ নিজেদের নৌশক্তি বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে পারে, যা বৈশ্বিক সামরিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করবে।

বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে একটি ‘নতুন স্নায়ুযুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। কেউ কেউ মনে করেন, ট্রাম্পের পদক্ষেপ কেবল রাশিয়ার প্রতি রাজনৈতিক বার্তা, যা সরাসরি সামরিক সংঘাতের দিকে নিয়ে যাবে না। তবে অন্যরা সতর্ক করে বলছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ ভুল বোঝাবুঝি বা অপ্রত্যাশিত সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস সেন্টারের জেমস অ্যাক্টন, বলেন, ‘ট্রাম্পের সাবমেরিন মোতায়েনের ঘোষণা একটি কৌশলগত বার্তা। তবে এটি পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে, যা বিপজ্জনক প্রবণতা।’ অন্যদিকে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ এর অ্যান্ড্রু কুচিন্স বলেন, ‘মেদভেদেভের বক্তব্য ক্রেমলিনের নীতির প্রতিফলন কি না তা নিশ্চিত নয়। তবে এটি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।’ আর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর মার্ক ফিটজপ্যাট্রিকের ভাষ্য, ‘উভয় পক্ষের বাগযুদ্ধ পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই উত্তেজনা কমানো জরুরি।’