ভরা মৌসুমেও ইলিশ বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের এমন ‘আকাশ ছোঁয়া’ দাম দেখা যায়নি। ক্রেতা-বিক্রেতারা এই দামকে বলছেন ‘অস্বাভাবিক’। সরকারি দপ্তরও বলছে, ইলিশের দাম এবার সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। জানা গেছে, এবার কম সরবরাহ, চাঁদাবাজি এবং ডিজেলের দাম বৃদ্ধির মতো কয়েকটি কারণে ইলিশের দাম চড়া। কেউ কেউ বলছেন, এখন সামর্থ্যে কুলাচ্ছে না। তারা অপেক্ষা করছেন যদি কখনো দাম কমে তখনই ইলিশ কিনবেন বলে।
এদিকে দেশের বাজারে ইলিশের এ ‘আকালের’ মধ্যেই দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে ইলিশ চেয়ে চিঠি দিয়েছেন, যা এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনাধীন।
ঢাকার খুচরা ও পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫০০-৬০০ গ্রাম ওজনের প্রতি পিস ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১০০০-১২০০ টাকার মধ্যে। যা গত বছর বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ৭০০-৮৫০ টাকার মধ্যে। ৭০০-৮০০ গ্রাম ওজনের একেকটি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৮০০-১৯০০ টাকার মধ্যে। যা গত বছর এক হাজার টাকার মধ্যেই পাওয়া যেত। আবার ৮০০-৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজি হিসেবে বিক্রেতারা ২০০০-২৩০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করছেন। এর চেয়ে বড় ইলিশের সবচেয়ে বেশি সরবরাহ থাকে ১ কেজি থেকে সোয়া কেজি ওজনের ইলিশের। যে ইলিশগুলো গত বছর বাজারভেদে কেজি প্রতি ১৬০০-১৮০০ টাকার মধ্যেই ভরা মৌসুমে বিক্রি হয়েছে। এ বছর এই ওজনের ইলিশ কমপক্ষে ২৮০০-৩৫০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে এই ওজনের যেসব ইলিশ সাগরের, সেগুলো আবার ২৫০০-২৮০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া কোনো কোনো বাজারে যে যেভাবে পারছেন দাম বাড়াচ্ছেন, উচ্চ মূল্য হাঁকছেন। এ অবস্থায় মধ্যেও এক শ্রেণির মানুষ ইলিশ কিনছেন, তবে বেশিরভাগ মানুষই ইলিশের দোকানমুখী হওয়ার সাহস দেখাচ্ছেন না। অনেকে আপাতত ইলিশ কেনার চিন্তাই ছেড়ে দিয়েছেন।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে মেরুল বাড্ডার পাইকারি বাজারে সকালে ইলিশ কিনতে গিয়েছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী কাওসার আহমেদ। দুই ছেলে-মেয়ের আবদার রাখতে ইলিশ কিনতে গিয়েও অস্বাভাবিক দাম শুনে খালি হাতেই বাজার থেকে ফিরেছেন। তিনি বলেন, আমার সামর্থ্যে কুলায়নি, তাই কিনতে পারিনি। অপেক্ষা করি, যদি কখনো দাম কমে তখনই ইলিশ কিনব।
প্রতিদিন রাত থেকে সকাল প্রায় ১০টা পর্যন্ত কারওয়ান বাজারে খুচরা ও পাইকারি দামে ইলিশ বিক্রি করেন মো. ইসমাইল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইলিশ ধরা পড়ছে কম, সরবরাহও কম। কিন্তু কম সরবরাহেও এবারে বরিশাল, চাঁদপুরের বিভিন্ন স্থানে গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দাম দিয়ে ইলিশ কিনতে হচ্ছে। এ কারণে আমরাও বেশি দামে ইলিশ বিক্রি করছি। কিন্তু দামের কারণে মানুষ ইলিশ কেনা একেবারেই কমিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, এবারের ইলিশের এই অস্বাভাবিক দাম ব্যবসায়ীদেরও অস্বস্তিতে ফেলেছে।
এদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, একে তো সরবরাহ কম, অন্যদিকে রয়েছে চাঁদাবাজি ও ডিজেলের বাড়তি দাম। এর সঙ্গে রয়েছে সিন্ডিকেট। সব মিলে ইলিশের দাম নাগালের বাইরে চলে গেছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সম্প্রতি বাংলাদেশ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকায় এক কেজির কম ওজনের ইলিশ ২ হাজার টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ইলিশের দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালে নেই। তবে সরবরাহ বাড়লে দাম কমবে বলে আশা করছি। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকেও ইলিশের দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইলিশের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সরবরাহ কম থাকার পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও ডিজেলের দাম বেশি হওয়ায় বর্তমানে ইলিশের দাম বেশি।
এদিকে দেশ রূপান্তরের বরিশাল প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বরিশালে এবার ভরা মৌসুমেও ইলিশের সরবরাহ কমে গেছে। যে কারণে দাম বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
এই অবস্থার মধ্যেই ইলিশ চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে চিঠি দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মৎস্য ব্যবসায়ীদের সংগঠন। গত ২৯ জুলাই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের কাছে ইলিশ চেয়ে চিঠি দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ‘ফিস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’। তারা আগামী সেপ্টেম্বরের দুর্গাপূজা উপলক্ষে ইলিশ আমদানি করতে চায়। যে চিঠিটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে পর্যালোচনা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের মাছ আমদানিকদের দেওয়া চিঠিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে গত বছর ২ হাজার ৪২০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়ায় ধন্যবাদও দিয়েছে। গত বছর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। তার পর আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতাকর্মীও ভারতে আশ্রয় নেয়। সে সময় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের এক ধরনের টানাপড়েন তৈরি হয়। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন ইলিশ চেয়েছিল। তখন জনতার অভ্যুত্থানে গঠিত সরকার প্রথমে দ্বিধার মধ্যে পড়লেও শেষদিকে এই আড়াই হাজার টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি প্রদান করে। তবে সে সময় বাজারের চেয়ে ইলিশের রপ্তানি মূল্য তুলনামূলক কম হওয়ায় বেশ সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারকে।