জলাশয় ভরাটে জলজট

খুলনার গুরুত্বপূর্ণ হামকুড়া, সালতা ও ভদ্রা নদী ভরাট হয়ে খাল-বিলের চেয়ে উঁচু হয়ে গেছে। এছাড়া শ্রী, হরি ও শৈলমারী নদী সরু হয়ে নাব্য হারিয়েছে। জেলার ৪৯৯ খালের মধ্যে ২৬০টিও একই দশায়। এ পরিস্থিতিতে ৬৪৩ জলমহালের মধ্যে ৪২০টি ইজারা দেওয়া হয়েছে। ইজারাকৃত জলমহালে বাঁধ ও নেট দিয়ে মাছ চাষ চলছে। ফলে বর্ষায় পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে, তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। শত শত পরিবার পানিবন্দি, জীবনযাত্রা ব্যাহত, প্রাণী, মৎস্য ও কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এটি খুলনাবাসীর জন্য বড় অভিশাপ।

গত সাত বছরে খুলনা সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে ৭২৮ কোটি টাকা খরচ করেছে। কিন্তু বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেও জলজট হচ্ছে। নিচু এলাকার মানুষ পানিবন্দি, হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগে।

সূত্র জানায়, যশোরের সদর, অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুর, খুলনার ডুমুরিয়া, ফুলতলা ও সাতক্ষীরার তালা উপজেলা নিয়ে গঠিত ২৪ নম্বর পোল্ডার, ভবদহ নামে পরিচিত। এখানে পানি নিষ্কাশন হতো হামকুড়া, সালতা, ভদ্রা, শ্রী, হরি ও শৈলমারী নদী দিয়ে। কিন্তু এখন হামকুড়া, সালতা ও ভদ্রা নদী ভরাট; শ্রী, হরি ও শৈলমারী সরু হয়ে নালায় পরিণত। ফলে বর্ষায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত, কোথাও কোথাও বন্ধ, ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় জানায়, ৬৪৩ জলমহালের মধ্যে ১৫৭টি তিন বছর, ৪১টি ছয় বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। ১৭৫টিতে খাস আদায়, ২১৪টিতে খাস আদায় নেই, ৪৭টি মামলায় স্থগিত, ৮টি উন্মুক্ত, ১টি বিলুপ্ত। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, ইজারাকৃত জলমহালে বাঁধ ও নেট দিয়ে মাছ চাষে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত, জলাবদ্ধতা তীব্র হচ্ছে।

খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আক্তার হোসেন বলেন, পানির প্রবাহে বাধা দেওয়া আইনবিরোধী। ব্যত্যয় হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এসিল্যান্ড ব্যবস্থা  নেবেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, ২৬০টি খাল (দৈর্ঘ্য ৬১৫.৯৯ কিমি, প্রস্থ ১৪.৭৮ কিমি) নাব্য হারিয়েছে, খনন প্রয়োজন। ৩৩৬ সøুইসগেটের মধ্যে ৮১টি অচল, ১০টি বিনষ্ট। এতে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত, ফসলের ক্ষেত ডুবে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

ডুমুরিয়ার গোলনা গ্রামের আব্দুস সালাম ও বামুন্দিয়ার এনামুল জোয়াদ্দার জানান, শত শত মানুষের উঠান-ঘর পানিতে ডুবে গেছে। ফসলের ক্ষেত, মৎস্য ঘের, ধানের বীজতলা নষ্ট। মাছ বেরিয়ে গেছে, গো-খাদ্যের সংকটে গরু কম দামে বিক্রি হচ্ছে। দিনমজুর, মৎস্যচাষি, গবাদিপশু খামারি ও কৃষক চরম ক্ষতির মুখে।

খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, হামকুড়া, সালতা-ভদ্রা ও শৈলমারী নদী খননের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি চলছে। শৈলমারী গেটের ৫টি কপাট সচল করা হচ্ছে, সেচ পাম্প বসানো হয়েছে। খাল খনন ও অচল সøুইসগেট সচলের কাজ চলছে।

খুলনা সিটি করপোরেশন জানায়, ২০১৮ থেকে জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ৯৭৩ কোটি টাকার প্রকল্পে ৭২৮ কোটি টাকা খরচে ১৩৪ কিমি ১৬২টি ড্রেন ও ১০টি নদী-খাল খনন করা হয়েছে। ছয়টি সøুইসগেট নির্মাণ চলছে। কিন্তু ভারী বৃষ্টিতে জলজট হচ্ছে, নিচু এলাকার বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পানিতে ডুবছে।

৩১ নম্বর ওয়ার্ডের মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ভারী বৃষ্টিতে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ডুবে যায়, সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

খুলনা নাগরিক কমিটির বাবুল হাওলাদার বলেন, ভৈরব ও রূপসা নদীর তলদেশ ভরাট, পানি নামতে পারছে না। জোয়ারে পানি শহরে ঢোকে। ২২টি খাল দখলমুক্ত বা সংস্কার হয়নি। প্রকল্পে গড়িমসি, ড্রেন পলিথিন-প্লাস্টিকে ভরাট, পরিষ্কারের অভাবে জলজট হচ্ছে। রয়্যাল মোড়, সাতরাস্তা, টুটপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুপানি জমে, রাস্তার কার্পেটিং উঠে গর্ত তৈরি হয়েছে। কেসিসির চিফ প্ল্যানিং অফিসার আবির উল জব্বার বলেন, খুলনা শহর নিচু, জোয়ারে পানি ঢোকে। উন্নয়ন কাজের বাঁধ কেটে পানি সরানো হচ্ছে। প্রকল্পের ৩০ শতাংশ কাজ সমাপ্ত হয়েছে। পুরো কাজ শেষ হলে জলজট কমবে।