তাদের কাছে বিপজ্জনক ৬৪ পুষ্টিকর খাবার!

খাদ্যসংক্রান্ত কুসংস্কার বা ‘ফুড ট্যাবু’র কারণে দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর গর্ভবতী নারীরা অপুষ্টির শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) গবেষকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, খাগড়াছড়ির ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের গর্ভবতী নারীদের মধ্যে খাদ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন কুসংস্কার বা ‘ফুড ট্যাবু’ রয়েছে। গর্ভকালে এই সম্প্রদায়ের নারীদের কমপক্ষে ৬৪টি পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে নিরুৎসাহিত করা হয়। এগুলোকে তারা ‘বিপজ্জনক’ বলে মনে করেন। গবেষকরা বলছেন, এই কুসংস্কার পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতা, প্রসবজনিত জটিলতা এবং নবজাতকের দুর্বলতা বাড়ায়।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে খাগড়াছড়িতে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর গর্ভবতী নারীদের ফুড ট্যাবু নিয়ে এই গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করেন ডা. লাবণ্য ত্রিপুরা। গবেষণায় বলা হয়, খাগড়াছড়ির ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের গর্ভবতী নারীদের ফলমূল, শাক-সবজি, মাছ, ডিম, মাংস, এমনকি কিছু পানীয় ও হালকা জলখাবার খাওয়া থেকে বিরত রাখা হয়। তাদের বিশ্বাস, এসব খাবার গর্ভের শিশুর জন্য ক্ষতিকর, গর্ভপাত বা প্রসবজনিত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

গবেষণায় আরও জানানো হয়, গর্ভবতী নারীর মা, শাশুড়ি, ননদ বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা এই ট্যাবু প্রচার ও প্রয়োগ করেন। কিছু ক্ষেত্রে ধাত্রী বা দাইও এই সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখেন।

গবেষকরা জানান, গবেষণায় অংশ নেওয়া ৪৭ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ট্যাবুর কারণে তারা গর্ভাবস্থায় এক বা একাধিক পুষ্টিকর খাবার থেকে বিরত ছিলেন। অথচ চিকিৎসা ও পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই খাবারগুলো গর্ভবতী মা ও গর্ভস্থ শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, এই খাবারগুলোর প্রায় সবই মা ও গর্ভের শিশুর জন্য পুষ্টিকর। তাই ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার দূর করে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে এই খাবারগুলো গ্রহণে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের প্রতি সম্মান জানিয়েই স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি গড়ে তুলতে হবে, যা ট্যাবু ভেঙে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে মায়েদের উৎসাহিত করবে। ট্যাবু দূর না হলে অপুষ্টি দূর হবে না। একজন গর্ভবতী নারীর খাবার শুধু তার নিজের জন্য নয়, একটি নতুন প্রাণের ভবিষ্যৎ গড়তেও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সচেতনতা বাড়াতে হবে।

বিএমইউর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালে যেসব খাবার থেকে বিরত থাকতে বলা হয়, তা কাম্য নয়। সব পুষ্টিকর খাবারই খেতে হবে। এসব খাবারের কারণে জন্মগত ত্রুটি হয় না, তা জোর দিয়ে বলতে হবে। মা ও গর্ভের শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে ফুড ট্যাবু দূর করতে ব্যাপকভাবে কাজ করতে হবে।’

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলাদেশে বৈচিত্র্যময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, যাদের প্রত্যেকের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিচয় আছে। দেশে ৫৪টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রায় ১৬ লাখ সদস্য রয়েছেন। এদের মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, মু, সাঁওতাল, খাসি, গারো, বম, হাজং ও মণিপুরী উল্লেখযোগ্য।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল হক এবং সঞ্চালনা করেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. খালেকুজ্জামান।

অন্য দুটি গবেষণা : অনুষ্ঠানে পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের পক্ষ থেকে আরও দুটি গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে কমিউনিটি পর্যায়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ বিষয়ে গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন ডা. অনির্বাণ চাকমা। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী, নানিয়ারচর ও রাঙ্গামাটি সদর উপজেলায় (রাঙ্গামাটি পৌরসভা ব্যতীত) বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ২৩৪ জন গবেষণায় অংশ নেন।

এই গবেষণায় বলা হয়, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে ঝুঁকিপ্রবণ সম্প্রদায়কে ম্যালেরিয়ার লক্ষণ, আবদ্ধ পানি অপসারণ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষিত ও সচেতন করতে হবে। সময়মতো চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যেতে সম্প্রদায়কে উৎসাহিত করতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণসংক্রান্ত আচরণ বিষয়ে গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন ডা. রাজন তালুকদার। গবেষণায় বলা হয়, বিশ্বে ৭৫ শতাংশ মৃত্যুর জন্য হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ দায়ী। বাংলাদেশে প্রায় ৭০ শতাংশ মৃত্যুর পেছনে এই রোগগুলো রয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রবীণরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হলেও গবেষণা ও নীতি আলোচনায় উপেক্ষিত থাকেন।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের আচরণ আর্থসামাজিক অবস্থা, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিশ্বাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা বাংলায় যোগাযোগ করায় ভাষাগত বাধা তৈরি হয় এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দীর্ঘ অপেক্ষার সময় প্রবীণদের সেবা গ্রহণে অনীহা সৃষ্টি করে। তাই স্থানীয় ভাষাভাষীদের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নিয়োগে অগ্রাধিকার, পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গ দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা, অপেক্ষার সময় ও ওষুধের মূল্য কমানোর সুপারিশ করা হয়।