মাদ্রাসা থেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ে সালমানের সফলতা

ফ্রিল্যান্সিং এমন এক পেশা, যেখানে মূল শক্তি হলো দক্ষতা। আপনি কোন বিষয়ে পড়াশোনা করেন, কোন প্রতিষ্ঠানে পড়েন, তা এখানে মুখ্য নয়। এখানে সার্টিফিকেট নয়, দক্ষতা ও কাজের মান দিয়েই নিজেকে প্রমাণ করতে হয়। এমনই এক জন উদাহরণ খুলনার আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র মো. সালমান। তিনি আলিম শ্রেণিতে পড়ার পাশাপাশি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন সফল ফ্রিল্যান্সার হিসেবে। প্রযুক্তিতে আগ্রহ ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি অর্জন করেছেন ডিজিটাল দক্ষতা, যা কাজে লাগিয়ে প্রতি মাসে গড়ে ৪০ হাজার টাকা আয় করছেন।

তিনি খুলনা সদরে মা-বাবা আর একমাত্র ছোট বোনকে নিয়ে থাকেন। খুলনাতেই তার বেড়ে ওঠা। মাত্র ১২ বছর বয়সে কোরআনের হাফেজ হন সালমান। এরপর খুলনা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে দাখিল পাস করেন। বর্তমানে আলিমে পড়ছেন। তার প্রথম আয় ছিল মাত্র ৪ হাজার টাকা। এক আমেরিকান ক্লায়েন্টের কাজ করে এই আয় করেছিলেন তিনি।

সালমান সব সময় চাইতেন নিজের মতো কিছু করবেন। সেই ইচ্ছা থেকেই একদিন ইন্টারনেটে ঘাঁটতে ঘাঁটতে জানতে পারেন, ফ্রিল্যান্সিং নামের একটি দুনিয়া রয়েছে, যেখানে ঘরে বসেই আয় করা সম্ভব। তবে শুরুটা সহজ ছিল না। যখন সালমান পরিবারের কাছে তার স্বপ্নের কথা বলেন, মা-বাবা তা সহজে মেনে নিতে পারেননি। তাদের সংশয় ছিল, ‘ইন্টারনেটে কাজ করে কি সত্যিই আয় করা যায়? ’ কিন্তু সালমান ছিলেন অদম্য মানসিকতার তরুণ। তিনি সহজে হার মানার মানুষ নন। এমন কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ান তার এক চাচা। সেই চাচাই সালমানকে সাহস দিয়ে বলেন, ‘শিখো, চেষ্টা করো, আমি আছি পাশে।’ চাচার সমর্থনই সালমানকে নতুন করে শক্তি জোগায়। এরপর এক বন্ধুর মাধ্যমে সালমান ভর্তি হন একটি অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং কোর্সে। ধীরে ধীরে শেখেন ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট রাইটিং, ডিজাইনিংয়ের মতো কাজ।

ফেসবুক মার্কেটিং, ফেসবুক অ্যাড, পেজ ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি কাজে সালমানের দক্ষতা ক্লায়েন্টদের মন জয় করে নিয়েছে। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের প্রায় সব ধরনের কাজ তিনি পারেন। ফলে একজন ক্লায়েন্ট সব কাজ তার থেকে করিয়ে নিতে পারে।

আমেরিকা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড, দুবাই ইত্যাদি দেশের ক্লায়েট রয়েছে তার। কাজের ক্ষেত্র হিসেবে আউট অব মার্কেট প্লাস তার পছন্দ। এখানে কাজ পাওয়া ফাইবার ও আপওয়ার্কের তুলনায় সহজ। তবে মধ্যে ফাইবারেও কাজ করেন তিনি। ভালো সময় ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা যদি ঠিক থাকে তাহলে পড়াশোনার সময় ফ্রিল্যান্সিং করা কোনো সমস্যা নয়। বরং পড়াশোনার সময় বাড়তি একটি স্কিল অর্জন করতে পারলে পরবর্তী সময়ে তা অনেক কাজে লাগে। এমনটাই মনে করেন সালমান।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের জীবনে আনন্দ-বেদনার অনেক ঘটনাই জমা আছে সালমানের। প্রথম দিকে অনেক চেষ্টা করেও কাজ পাচ্ছিলেন না। তখন এক আমেরিকান ক্লায়েন্ট তার মেসেজের জবাব দেয়। এরপরে কাজটা করে দেওয়ার বিনিময়ে ৪ হাজার টাকা পান সালমান। এটা তার জীবনের অন্যতম সেরা আনন্দের ঘটনা। প্রথম আয়ের টাকা মায়ের হাতে তুলে দেন তিনি। তখন মায়ের চোখ থেকে টপ টপ করে আনন্দাশ্রু ঝরেছিল। যেটা আজও সালমান ভুলতে পারেননি। আবার পাকিস্তানি এক বায়ার প্রায় ১০ হাজার টাকার কাজ করিয়ে নেয়। তারপর পেমেন্ট না দিয়ে সালমানকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে দেয়। এই ঘটনায় সালমান মনে অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন। আরেকবার কাছের একজন শুধু মোবাইল হ্যাক করে সব জায়গা থেকে সালমানের অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দেয়। এই ঘটনার পর তিনি রীতিমতো মুষড়ে পড়েন। কিন্তু হাল ছেড়ে না দিয়ে শক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ান।

সালমান পরিচিত অনেককে ফ্রিল্যান্সিং শিখিয়েছেন। যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়, এমন মানুষদের ফ্রিল্যান্সিং শেখানোর জন্য বেছে নেন তিনি। যেন তারা ফ্রিল্যান্সিং শিখে পরিবারের হাল ধরতে পারে। তিনি শেখানোর পাশাপাশি পরিচিত ক্লায়েন্টদের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন অনেককে। এ ছাড়া ছোট ছোট বাচ্চাদের কোরআন শরিফ পড়ানোর কাজে সাহায্য করেন। ভবিষ্যতে তিনি এমন একজন উদ্যোক্তা হতে চান, যিনি শতশত বেকার মানুষের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি করবেন।