বরিশাল থেকে দেশ জুড়ে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম) দুর্বল অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবার বেহাল অবস্থা এবং দায়সারা প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বরিশালে চলমান টানা ১৪ দিনের ছাত্র-জনতার আন্দোলন নতুন মোড় নিয়েছে। গতকাল রবিবার বিকেলে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীরা স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বলেছেন এই সময়ের মধ্যে দাবি না মানলে দেশে কঠোর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।

আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক মহিউদ্দিন রনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘স্বাস্থ্য উপদেষ্টা যদি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বরিশালে না আসেন, যদি নিজে এসে তদন্ত করে সমস্যার সমাধান না করেন, তাহলে আমরা বরিশালবাসীর সঙ্গে সারা বাংলাদেশের মানুষকে রাজপথে আহ্বান জানাব। ঘরে ঘরে, জেলা-জেলায়, বিভাগে বিভাগে আমরা আন্দোলনের দুর্গ গড়ে তুলব। তখন আর কোনো সতর্কবার্তা নয়, কর্মসূচি হবে কঠোর থেকে কঠোরতম।’

১৪ দিনের আন্দোলন, শুনছে না কেউ : রনি অভিযোগ করেন, টানা ১৪ দিন বরিশালে আন্দোলন চললেও কেন্দ্রীয় সরকার বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে কেউ যোগাযোগ করেননি। ‘প্রথমে টাউন হলে অবস্থান, পরে মেডিকেলের সামনে দফায় দফায় আন্দোলন করেছি। দিনের পর দিন বসে থেকেছি। কিন্তু কোনো প্রতিনিধি তো দূরের কথা, একটি ফোন কল পর্যন্ত আসেনি। বরিশাল কি এই দেশের অংশ নয়?’ প্রশ্ন রাখেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আজ হাজার হাজার বরিশালবাসী রাজপথে। ছাত্র, শ্রমিক, জনতা দলমত নির্বিশেষে সবাই একত্র হয়েছেন। কারণ, শেবাচিমের দুরবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত মানুষ মারা যাচ্ছে, বাঁচতে পারছে না। অথচ সরকার নির্বিকার। এই অবহেলা আমাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত।’

সংবাদ সম্মেলনে রনি বলেন, ‘আমরা মরতে শিখেছি, ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমাদের শান্তিপূর্ণ দাবি যদি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে রাজপথেই ফয়সালা হবে। ২৪ জুলাই যারা আহত ও নিহত হয়েছেন, তাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কেউ ক্ষমতায় বসতে পারবেন না। আমরা এই লড়াই ছাড়ব না।’

তিনি আরও জানান, যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বরিশালে না আসেন, তাহলে সর্বাত্মক কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হবে। দেশের প্রতিটি বিভাগে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া হবে, যা থামানো যাবে না।

গতকাল রবিবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। এতে শহরের ভেতর ও বাইরের যান চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে। জরুরি প্রয়োজনে থাকা রোগী, নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষ মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েন। তবু আন্দোলনকারীরা বলেন, ‘এই কষ্ট সাময়িক, কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে হলে আজই রুখে দাঁড়াতে হবে।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও পদক্ষেপ : শেবাচিম সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গতকাল সকালে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে চলমান বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রোগীসেবার মান উন্নয়নে তারা একাধিক প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে স্বেচ্ছাসেবী ট্রলিম্যানদের অপসারণ, সরকারি কর্মীদের দিয়ে নতুন ট্রলি সার্ভিস চালু, ৭টি মনিটরিং টিম গঠন, ১০০টি সিলিং ফ্যান ও নতুন বেড সরবরাহ, ৯০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ, ২০টি স্প্রে মেশিন চালু, দালাল ও হকারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, অভিযোগ বক্স স্থাপন এবং হাসপাতালের সব টয়লেট ও লিফট সংস্কার কার্যক্রম।

এছাড়া, বহিঃস্থ প্রভাব প্রতিরোধে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং দুর্নীতির অভিযোগে ওয়ার্ড মাস্টারসহ একাধিক কর্মচারীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৪৬০ শয্যার ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগ কেন্দ্রের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আগামী ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হবে বলে জানানো হয়েছে।

পরিচালক  ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিদিন শেবাচিমে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে, যা হাসপাতালের বিদ্যমান সক্ষমতার ছয় গুণ বেশি। এই চাপে সেবা ব্যাহত হচ্ছে স্বীকার করে তিনি বলেন, অবকাঠামো ও জনবল বাড়াতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।

তবে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে এ বিষয়ে মহিউদ্দিন রনি জানেন কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা চাহিদাপত্র সম্পর্কে  জানি না। স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে বরিশালে এসে এর সমস্যা সমাধান করতে হবে।

আন্দোলনের মুখপাত্র নাভিদ নাসিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ সেনাবাহিনী আমাদের আন্দোলন থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এতে আমাদের অনেকেই আহত হয়েছেন। তবুও আমরা রাজপথ ছাড়িনি। আমরা দাবি আদায় করেই ঘরে ফিরব। এটি এখন শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নয়, বরং বরিশালবাসীর আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। আমরা স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপ চাই।’