ফের অস্থির হয়ে উঠেছে মোহাম্মদপুরে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের আবাসস্থল জেনেভা ক্যাম্প। মাদকের কারবারের দখল নিয়ে ক্যাম্পের দুটি গ্রুপের মধ্যে টানা পাঁচ দিন ধরে সংঘর্ষ চলছে। একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলির ঘটনায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এ সংঘর্ষ গতকাল সোমবার ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সংঘর্ষে ককটেল বিস্ফোরণ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ওই ঘটনায় একজন নিহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়েকশ পুলিশ মোতায়েন করে অভিযান চালায় পুলিশ। চাপাতিসহ ফয়সাল ও সেলিম নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানান, মাদক কারবারি পিচ্চি রাজা ও বুনিয়া সোহেল গ্রুপের দ্বন্দ্বে এ সংঘাত শুরু হয়। গ্রুপের একাধিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সম্প্রতি তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। পরে মাদকের আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে আবারও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তবে এলাকা এখন শান্ত রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে আতঙ্কিত স্থানীয় বাসিন্দারা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে শীর্ষ মাদক কারবারিরা মাদকের স্পট দখলে নিতে কয়েক দিন ধরে ভয়াবহ সংঘর্ষে জড়িয়েছে। এমন ভয়াবহ সংঘর্ষের নেপথ্যে শান্তি বাহিনী নামক জেনেভা ক্যাম্পের একটি সন্ত্রাসী বাহিনী জড়িত বলে বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন। জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারিদের অনেকেই আদালত থেকে জামিনে ছাড়া পাওয়ায় নতুন করে এ সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। এমন অবস্থায় কারবারিদের সব মামলায় জামিন বাতিল চেয়েছেন বাসিন্দারা। অভিযোগ রয়েছে, থানা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ থাকায় শীর্ষ মাদক কারবারিরা সবসময় থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। শীর্ষ কারবারি বুনিয়া সোহেল, পিচ্চি রাজা, মনু, ইশতিয়াক ও শান্তি বাহিনী মিলে একের পর এক স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর হামলা করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ঘটনার সময় বুনিয়া সোহেলকে পিস্তল হাতে গুলি চালাতে দেখা গেছে। সংঘর্ষে বশির বাবুর্চি (৪০), মদিনা (২০) ও ফায়জান (২৫) আহত হন। তাছাড়া সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন শাহ আলম। লাশ মর্গে রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এসিডি) জুয়েল রানা জানান, আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে কারবারিরা। নিয়মিত তাদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। এরপরও তারা জামিনে বের হয়ে ব্যবসা দখলে নিতে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে। শিগগিরই তারা আইনের জালে আটকা পড়বে।
জেনেভা ক্যাম্পের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারি বুনিয়া সোহেল ও বেজি নাদিম মিলে সন্ত্রাসী বাহিনী শান্তি বাহিনীকে ভাড়া করে। শান্তি বাহিনীর প্রধান শাহনেওয়াজ সান্নুর নেতৃত্বে পিচ্চি রাজার মাদকের স্পট দখলে নিতে প্রথমে ককটেল বিস্ফোরণ করে হামলা চালায়। এ সময় শান্তি বাহিনীর সঙ্গে বুনিয়া সোহেলকে পিস্তল উঁচিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। পুরো জেনেভা ক্যাম্পের মাদক সাম্রাজ্য দখলে নিতে বুনিয়া সোহেলের সঙ্গে বেজি নাদিম, পোপলা মুন্না, চুয়া সেলিম, খুল্লা সাহিদ ও দোগলা আজম যোগ দিয়েছে। আর এসবের জন্য ক্যাম্পে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে।
ক্যাম্পের বাসিন্দা এক স্কুলশিক্ষক জানান, সোমবার ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টর এলাকায় দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে দুপক্ষ। কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণে এলাকায় প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। দুপুর দেড়টার দিকে প্রতিপক্ষরা মাদক কারবারি বুনিয়া সোহেল গ্রুপের সদস্য শাহ আলমকে একা পেয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরের শেষ মাথায় হুমায়ুন রোড ময়লার গলিতে এ ঘটনা ঘটে। এতে করে পুরনো দ্বন্দ্ব আবার নতুন করে শুরু হয়েছে।
ক্যাম্পের বাসিন্দা জিয়াউদ্দিন জানান, গত শুক্রবার মাদক কারবার কেন্দ্র করে বুনিয়া সোহেল পিচ্চি রাজাকে লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। বুনিয়া সোহেল মোটরসাইকেলে করে এসে প্রকাশ্যে ককটেল ফাটিয়ে আবার চলে যায়। সোমবার দুপুরেও মাদক কারবারিরা জন্ডিস গলিতে এসে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। তিনি আরও বলেন, পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জেনেভা ক্যাম্পে ঢোকার আগেই তারা খবর পেয়ে যায়। তারা বিভিন্ন স্থানে সোর্স রাখে যাতে করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঢুকলে তাদের কাছে দ্রুত খবর পৌঁছায়।
থানা পুলিশ জানায়, বুনিয়া সোহেলের নামে ৩০টি মামলা রয়েছে। সে জেনেভা ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরের আব্দুস সালামের সন্তান। তাছাড়া পোপলা মুন্না, বেজি নাদিম, পিচ্চি রাজা, চুয়া সেলিম, খুল্লা সাহিদ ও দোগলা আজমের নামে একাধিক মাদক ও হত্যা মামলা রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার বছর ২০২৪ সালে মাদক কারবারের দখল নিয়ে কয়েক দফা সংঘাত ও কয়েকজনের প্রাণহানির পর সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সে সময় কয়েক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সম্প্রতি তারা জামিনে বেরিয়ে পুরনো কারবারে নেমে পড়ে। মাদক স্পট দখল নিতে ফের সংঘাতে জড়াচ্ছে। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে পূর্বাচলে র্যাবের ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হন পাঁচ্চিশ। এরপর ভারতে পালিয়ে যান ইশতিয়াক। মহামারীর সময় কভিড আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান বলে ক্যাম্পে জনশ্রুতি আছে। সম্প্রতি ৭ নম্বর সেক্টরের হুমায়ুন রোড এলাকায় নতুন করে মাদক বিক্রি করা শুরু করেছে পিচ্চি রাজা ও ইমতিয়াজ। পিচ্চি রাজা একসময় বুনিয়া সোহেলের সঙ্গে কাজ করলেও এখন চুয়া সেলিমের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে বলে ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানিয়েছেন। আর ইমতিয়াজ ক্যাম্প এলাকায় চুয়া সেলিমের পুরনো বন্ধু হিসেবে পরিচিত।