পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকার দিয়ে সাগরে জমে থাকা বরফ ভেঙে স্বাভাবিক রাখা হয় সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম। সেই আইসব্রেকার বা বিশেষায়িত জাহাজে চড়ে এবার রাশিয়ার উত্তর মেরুতে প্রায় সাড়ে ১ হাজার ২০০ মাইল সমুদ্রপথ পাড়ি দেবে বাংলাদেশসহ ২১ দেশের শিক্ষার্থী।
টানা ১০ দিনের এই রোমান্সকর অভিযানটি আজ বুধবার রাশিয়ার মুরমান্সক সমুদ্রবন্দর থেকে শুরু হবে। চার দিন পর পারমাণবিক জাহাজটি উত্তর মেরুতে পৌঁছাবে। ষষ্ঠারের মতো এই অভিযান পরিচালিত হবে। এ ধরনের আয়োজন বিশ্বের আর কোথাও হয় না।
এতে সহযোগিতা করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রসাটম, যারা বাংলাদেশের রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে।
পৃথিবীর অন্যতম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ রাশিয়া। ৮০ বছর ধরে পারমাণবিক শিল্পের বহুমুখী ব্যবহার আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অনেকটা পথ প্রদর্শকের ভূমিকায় আছে দেশটি।
রাশিয়া তাদের পারমাণবিক শক্তির এই নানামুখী ব্যবহার এবং এ-সংক্রান্ত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে চাই বিশ্ব জুড়ে। সেজন্য প্রায় বছর জুড়েই বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও অন্যদের নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন নানা আয়োজন করে থাকেন তারা।
যার একটি অংশ আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক প্রকল্প ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’। প্রকল্পটির আওতায় পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকারে করে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের নিয়ে উত্তর মেরুতে অভিযান চালানো হয়।
এবারের অভিযান রাশিয়ার পারমাণবিক শিল্পের ৮০তম বার্ষিকী এবং উত্তর সমুদ্র পথ অনুসন্ধানে রাশিয়ার সূচনার ৫০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত হচ্ছে।
‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ প্রকল্পের লক্ষ্য হলো পারমাণবিক প্রযুক্তির প্রসার, মেধাবী ও প্রতিভাবান শিশুদের খুঁজে বের করা ও সমর্থন দেওয়া। একই সঙ্গে তাদের দক্ষতা বিকাশে সাহায্য করা এবং পেশাগত দিকনির্দেশনা দেওয়া।
রসাটমের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের একজনসহ ২১টি দেশের ৬৬ জন মেধাবী, কৌতূহলী ও সক্রিয় শিক্ষার্থী ‘৫০ লেত পবেদি’ (৫০ বছরের বিজয়’) পারমাণবিক আইসব্রেকারে অভিযানে অংশ নেবে। তাদের সঙ্গে থাকবেন বিজ্ঞানী, পারমাণবিক শিল্পের বিশেষজ্ঞ এবং আর্কটিক গবেষকরা। বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এই তরুণদের বাছাই করেছে রসাটম।
উত্তর সমুদ্র পথ হলো ইউরেশিয়ার পশ্চিমাংশ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত নৌপথ এবং রাশিয়ার একটি ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা জাতীয় পরিবহন ধমনি। এই পথের বিকাশের ইতিহাস শুরু হয় একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পোমরদের (হোয়াইট সি ও আর্কটিক মহাসাগরের উপকূলবর্তী বাসিন্দা) প্রথম নৌযাত্রার মাধ্যমে। তাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ১৫২৫ সালে রুশ কূটনীতিক দিমিত্রি গেরাসিমভ উত্তর জলপথের বাস্তব ব্যবহারের ধারণা উপস্থাপন করেন।
উত্তর সমুদ্র পথটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কিমি, যা আর্কটিক মহাসাগরের কারা, লাপতেভ, পূর্ব সাইবেরিয়ান ও চুকচি সাগর অতিক্রম করেছে।
রাশিয়ার এই উত্তর সমুদ্র পথে গত বছর প্রায় ৩৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন টন পণ্য পরিবহন করে নতুন রেকর্ড স্থাপন করে। একই বছরে নজিরবিহীন ৯২টি ট্রানজিট ভ্রমণ হয় এবং ট্রানজিট পণ্য পরিবহনে ৩ মিলিয়ন টনেরও বেশি রেকর্ড অর্জিত হয়।
অন্যদিকে মুরমান্সক রাশিয়ার একটি অন্যতম বাণিজ্যিক সমুদ্রবন্দর, যা দেশটির কার্গো হ্যান্ডলিং ক্ষমতার দিক থেকে শীর্ষ ১০ বন্দরের মধ্যে একটি।
রাশিয়া বিশ্বের একমাত্র দেশ, যার কাছে পারমাণবিক আইসব্রেকার বহর রয়েছে। এই বহর পরিচালনা করে অ্যাটমফ্লট, যা রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রসাটমের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে রাশিয়ার পারমাণবিক আইসব্রেকার বহরে আটটি জাহাজ রয়েছে এবং আরও চারটি পারমাণবিক আইসব্রেকার নির্মাণাধীন।