দেশের অভ্যন্তরে গত কয়েক দিনে তেমন বৃষ্টি হয়নি। উত্তরাঞ্চলের বৃষ্টি নদ-নদীর পানি বাড়িয়ে বন্যায় রূপ নেওয়ার মতো নয়। তবু দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসা নদীগুলোতে পানির প্রবাহ বেড়েছে। গঙ্গা নদীতে এ সময়ে সাধারণত এক দিনে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি প্রবেশ করে, কিন্তু গত সোমবার প্রবেশ করেছে ৪৭ হাজার ২৯০ কিউসেক পানি। তবে পানির পরিমাণ বেশি হলেও তা বিপদসীমা অতিক্রম করেনি বলে জানান আমাদের চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি। তিনি জানান, এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় পানির পরিমাণ বেশি ছিল। এক সপ্তাহ ধরে বেশি পানি থাকায় শিবগঞ্জ উপজেলার পাকা ইউনিয়ন ও সদর উপজেলার নারায়ণপুর এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
পানি বাড়ার তথ্য জানিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের মুখপাত্র ও নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবারের বন্যা মৌসুমি। প্রতি বছর এ সময়ে বন্যা হয়, তাই এটি নতুন কিছু মনে হচ্ছে না। তবে একটি বিষয় ব্যতিক্রম।’ ব্যতিক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভারতের গঙ্গা নদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে গত ১১ আগস্ট ৪৭ হাজার ২৯০ কিউসেক পানি এসেছে। গত ২০ বছরে এত বেশি পানি আসেনি। সাধারণত এ মৌসুমে এক দিনে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি আসে।’
বাড়তি পানির কারণ জানতে চাইলে সরদার উদয় রায়হান বলেন, ‘ভারতের বিহার, উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় গত ১৫ জুলাই থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেই পানি গঙ্গা নদী দিয়ে আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে। এ ছাড়া যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায়ও পানির প্রবাহ বাড়ছে।’
গঙ্গায় বেশি পানি প্রবাহের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বাড়তি পানি মূলত ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে। বর্ষায় ফারাক্কা বাঁধের সব গেট খোলা থাকে আর পানি আমাদের দিকে নেমে আসে। তবে গঙ্গায় এ মাত্রায় পানি বাড়ে না। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র মিলিত হয়ে পদ্মা নদীতে পানি বাড়ে, যেখানে বন্যা দেখা দেয়।’
বৃষ্টিপাত সম্পর্কে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, ‘আগামী দুদিন পর থেকে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। তবে দেশে বন্যার জন্য অভ্যন্তরীণ বৃষ্টির তুলনায় উজানের বৃষ্টি প্রধান কারণ। দেশের অভ্যন্তরীণ বৃষ্টি বন্যার জন্য মাত্র ১০ শতাংশ দায়ী।’
এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে সরদার উদয় রায়হান বলেন, ‘মূলত উজানের বৃষ্টির কারণে দেশের ৯০ থেকে ৯২ শতাংশ বন্যা হয়।’ তিনি বলেন, ‘গঙ্গার পানির প্রবাহ কমছে। তবে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীতে পানির প্রবাহ আরও দুদিন বাড়তে পারে। এতে লালমনিরহাট, নীলফামারী, নওগাঁ, রাজবাড়ী, পাবনা, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুরসহ আশপাশের এলাকায় বন্যা দেখা দিতে পারে। এই বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার লক্ষণ নেই।’
দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা নেই জানিয়ে অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার প্রভৃতি নদীতে পানি বাড়ছে, ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হবে। সাগরের উপকূলে নিম্নচাপের জোয়ারের প্রভাব না থাকায় পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তবু নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।’
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোতেও পানির প্রবাহ বাড়ছে, ফলে অনেক এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, দফায় দফায় বৃষ্টির কারণে গাইবান্ধার সব নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। প্রধান চারটি নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার ১৬৫টি চরের নিম্নাঞ্চল ধীরে ধীরে প্লাবিত হচ্ছে। নদী থেকে চরাঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে। তবে নদীর পানি বিপদসীমার সামান্য নিচে রয়েছে। এ ছাড়া টানা বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সদ্য রোপণ করা আমন ধান পানিতে পচে নষ্ট হচ্ছে, ফলে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, তিস্তার পানি কমলেও বানভাসীদের দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে। ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহের পর উজানে ঢল থেমে যাওয়ায় তিস্তার পানি দুদিন পর বিপদসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি কমলেও নীলফামারী ও লালমনিরহাটের তিস্তা অববাহিকার বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। তিস্তার পানি বিপদসীমার নিচে নেমে এলেও তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত থাকায় জেলার প্রায় দুই হাজার পরিবার পানিবন্দি রয়েছে।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, বৃষ্টি ও উজানের ঢলে তিস্তার পানি ফুলে-ফেঁপে উঠলেও রাতারাতি কমে বিপদসীমার নিচে নেমেছে। ফলে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তার আগের দিন একই সময়ে পানি বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় পানির প্রবাহ ২৭ সেন্টিমিটার কমেছে।