সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, ‘এই দেশে ধর্ম-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। বাংলাদেশে সবার অধিকার সমান। আমরা সবাই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রেখে চলছি, ভবিষ্যতেও চলব।’ সনাতন সম্প্রদায়ের মহাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর পলাশী মোড়ে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘সম্মানিত অতিথি’ হিসেবে বক্তব্যকালে এসব কথা বলেন তিনি। প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সেনাপ্রধান, ‘সম্মানিত অতিথি’ নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি (জেনারেল অফিসার কমান্ডিং) মেজর জেনারেল মো. মঈন খান। জন্মাষ্টমীর উৎসব ও শোভাযাত্রার আয়োজন করে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি ও শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির।
সেনাপ্রধান বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এই দেশে শত শত বছর ধরে হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, পাহাড়ি-বাঙালি, উপজাতি সবাই মিলে আমরা অত্যন্ত শান্তিতে সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে যাচ্ছি। আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হবে সম্প্রীতির এই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ আমরা সবসময় বজায় রাখব এবং একসঙ্গে সবাই শান্তিতে সুন্দরভাবে বসবাস করব। এখানে ধর্ম-জাতি, বর্ণ-গোত্রের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। এই দেশ সবার।’ উপস্থিতজনদের উদ্দেশে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘সারা দেশে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন আছে। আমরা সবাই মিলে আপনাদের পাশে থাকব। এক হয়ে আপনাদের সঙ্গে কাজ করে যাব। আপনারা নিশ্চিন্তে এ দেশে বসবাস করবেন। আপনাদের যত ধর্মীয় পর্ব, আপনারা উদযাপন করবেন, আনন্দ উদযাপন করবেন। আমরা একসঙ্গে এই আনন্দ ভাগাভাগি করে নেব।’
ঢাকায় জন্মাষ্টমীর ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘উনিশ শতকে এবং বিশ শতকে এটা সবসময় হতো। তারপর একসময় বন্ধ হয়ে যায়। আবার শুরু হয়েছে।’ তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘এই উৎসব সবসময় জারি থাকবে। মিছিল সবসময় জারি থাকবে। আমাদের পক্ষ থেকে যত ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা আপনারা চান, আমরা সেসব সাহায্য-সহযোগিতা আপনাদের দেব।’ সেনাপ্রধান বলেন, ‘শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ুক। এই আদর্শের ভিত্তিতে আমরা সুন্দরভাবে এ দেশে একসঙ্গে বসবাস করব।’
সেনাপ্রধানের বক্তব্যের আগে নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান বলেন, ‘জন্মাষ্টমী কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং শান্তি, সম্প্রীতি এবং মানবতার এক উদাত্ত আহ্বানও। শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা-জীবনাদর্শ শুধু অসত্য-অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহসই জোগায় না, একই সঙ্গে অসহায়-আর্তমানবতার পাশে দাঁড়াতে এবং সমাজে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, সহনশীলতা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।’ তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আসুন, পারস্পরিক সহনশীলতার মাধ্যমে দেশকে আরও শক্তিশালী করি। শ্রীকৃষ্ণ যেন সমাজে ন্যায় ও আলোর সত্য প্রজ্বলিত করেন।’
অনুষ্ঠানে বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন বক্তব্যে বলেন, ‘শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা শুধু অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসই জোগায় না, ন্যায়ের পথেও চলতে শেখায়।’ তিনি বলেন, ‘এই বাংলাদেশ আমাদের সবার। স্বাধীনতাকে রক্ষা করা আমাদের সবার পবিত্র দায়িত্ব। সবাই মিলে কাজ করলে বিশ্বের মানচিত্রে এই বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারব।’ তিনি বলেন, ‘সত্যের পথে অটল থাকতে হবে। অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে রুখে দাঁড়াতে হবে। সবার সঙ্গে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। পুরান ঢাকায় বেড়ে উঠেছেন উল্লেখ করে বিমানবাহিনী প্রধান বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই একটা সম্প্রীতির মাধ্যমে বড় হয়ে উঠেছি, যেখানে আমরা কখনো ধর্ম নিয়ে ভেদাভেদ করিনি। শান্তি ও উন্নতির জন্য ঐক্য অপরিহার্য।’ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেব। আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিচালনা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তাপস চন্দ্র পাল প্রমুখ।