গাজা থেকে লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে স্থানান্তরিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এ পদক্ষেপকে তারা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করলেও ইউরোপ ও আরব বিশ্বের সরকারগুলো একে অবাস্তব এবং আন্তর্জাতিক আইনের সম্ভাব্য লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচনা করেছে। নেতানিয়াহুর সরকার যখন এমন প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তখন খোদ ইসরায়েলেই গাজা যুদ্ধ বন্ধ ও বন্দি থাকা জিম্মিদের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করছেন হাজারো সাধারণ মানুষ। ইসরায়েলের অনেক জায়গায় বিক্ষোভকারীরা যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে করে ইসরায়েল জুড়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এদিকে, ইসরায়েলের অবরোধে চরম মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছেন গাজার বাসিন্দারা। উপত্যকাটিতে প্রতিদিন অন্তত ১ হাজার ট্রাক ত্রাণসহায়তা প্রয়োজন। তবে দিনে কমবেশি ১০০টি ট্রাক গাজায় প্রবেশ করছে। এটি প্রয়োজনের মাত্র ১০ শতাংশ। সেই সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসনে নিহতের সংখ্যা বাড়ছেই। গাজা সিটির আল-আহলি হাসপাতালে ইসরায়েলের বোমা হামলায় অন্তত ৭ জন নিহত হয়েছে। অন্যদিকে, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের জন্য সব ধরনের ভিসা স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের ধারণা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছিল। তবে চলতি বছরের শুরুতে ডোনাল্ড ট্রাম্প এ রকম ভাবনার কথা জানানোর পর ধারণাটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। সেই আলোচনা এখন কিছুটা স্তিমিত হলেও এই ধারণার সমর্থকরা এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা লিবিয়া, দক্ষিণ সুদান, সোমালিল্যান্ড ও সিরিয়াসহ প্রায় ছয়টি দেশ ও অঞ্চলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, যাতে তারা স্বেচ্ছায় গাজা ছাড়তে রাজি হওয়া ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করে। কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, গাজার বাসিন্দাদের সিনাই উপদ্বীপে পুনর্বাসিত করার জন্য মিসরকেও চাপ দিচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এক সময় গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণকারী মিসর এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। গাজার সঙ্গে সীমান্ত থাকায় এই পরিকল্পনার প্রবক্তাদের চোখে মিসর কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক গন্তব্য। এই চাপের জেরে মিসর-ইসরায়েলের বেশ কয়েকটি উত্তপ্ত বৈঠক হয়েছে বলে জানিয়েছে কিছু সূত্র।
কিছু সূত্র জানিয়েছে, গাজাবাসীদের দক্ষিণ সুদান বা লিবিয়ায় পুনর্বাসনের বিষয়ে ইসরায়েলের আলোচনা এখনো চলছে। তবে সিরিয়া বা সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডে ফিলিস্তিনিদের বসতি স্থাপনের জন্য আগের আলোচনা তেমন কোনো অগ্রগতি লাভ করেনি বলে এক ব্যক্তি জানান। যেসব গন্তব্য বিবেচনা করা হচ্ছে, তার বেশিরভাগেরই গৃহযুদ্ধ ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার মতো নিজস্ব সমস্যা রয়েছে। লাখ লাখ অভিবাসীকে আত্তীকরণ করতে ওইসব অঞ্চলকে হিমশিম খেতে হতে পারে। তবে তাদের এই দুর্বল অবস্থার কারণেই এমন চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় গাজা বা অন্য কোথাও থেকে স্থানান্তরিত মানুষদের গ্রহণের বিনিময়ে তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা বা অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হতে পারে। বিভিন্ন আইনি সংস্থা, মানবাধিকার গোষ্ঠী ও কিছু সরকার প্রশ্ন তুলেছে, এই স্থানান্তর প্রকৃতপক্ষেই স্বেচ্ছায় হবে কি না। মালয়েশিয়া, জাতিসংঘ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ অনেকেই সতর্ক করেছে, এই ধারণাটি জাতিগত নিধনের শামিল হতে পারে। দক্ষিণ সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইসরায়েলের সঙ্গে এ ধরনের আলোচনায় যুক্ত থাকার দাবি ভিত্তিহীন। সোমালিল্যান্ড সরকারের একজন প্রতিনিধি বলেন, কোনো আলোচনা চলছে না। লিবিয়া ও সিরিয়ার কর্মকর্তারা এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
এদিকে, গাজা যুদ্ধ বন্ধ ও জিম্মিদের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবসহ বেশ কয়েকটি শহরে। চলতি মাসের শুরুতে নেতানিয়াহু গাজার গাজা সিটি দখলের পরিকল্পনার পর সাধারণ ইসরায়েলিরা ১৭ আগস্ট বিক্ষোভের ডাক দেন। সেই অনুযায়ী শত শত ইসরায়েলি রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, রবিবার সকাল থেকে অন্তত ২৫ জনকে আটক করা হয়েছে। রাস্তা আটকে যান চলাচল বন্ধ করে চলাচল বাধাগ্রস্ত করায় তাদের আটক করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেছেন, জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং চলাচলের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করায় বাণিজ্যিক রাজধানী তেল আবিব থেকে ১১ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে জেরুজালেমের রুট ১৬ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা আটকে রেখেছে বিক্ষোভকারীরা। সাধারণ ইসরায়েলিদের বিক্ষোভকে সমর্থন জানিয়েছেন ইসরায়েলি বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ। জেরুজালেমের জিম্মি স্কোয়াডে গিয়ে তিনি বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে বলেন, জিম্মিরা কোনো বন্ধকী জিনিস নয় যে, তাদের পরিত্যাগ করে ইসরায়েলি সরকার যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।
অন্যদিকে, গাজায় তীব্র ত্রাণসংকট দেখা দিয়েছে। ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, গাজায় দৈনিক অন্তত এক হাজার ট্রাক ত্রাণের প্রয়োজন। তবে প্রতিদিন প্রবেশ করছে মাত্র ১০০ ট্রাক। আবার এই ত্রাণের বেশির ভাগই ব্যবসায়ীদের কাছে চলে যাচ্ছে। ফলে উপত্যকাটির বাসিন্দাদের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। গতকাল রবিবারও গাজায় নারকীয়তা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। গাজা সিটির আল-আহলি হাসপাতালে ইসরায়েলের বোমা হামলায় অন্তত ৭ জন নিহত হয়েছে।