সরকারের কাছে হকি বন্ধের দাবি জানাতে মন চায়

দীর্ঘ ১৬ বছরের হকি ক্যারিয়ারের ক্রান্তিলগ্নে কেবল হতাশা সঙ্গী হয়েছে পুস্কর খীসা মিমোর। দূর পাহাড় থেকে বিকেএসপি হয়ে হকি অঙ্গনে সুনাম কুড়িয়েছিলেন। দেশের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড হিসেবে নিয়মিতই ছিলেন জাতীয় দলে। তবে এশিয়া কাপগামী দলে তাকে রাখেনি হকি ফেডারেশনের সিলেকশন কমিটি। বাদ পড়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি দেশের হকির অন্ধকার দিকগুলো দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ'র কাছে তুলে ধরেছেন মিমো

শুরুতেই জানতে চাই হকি কেন খেলেন?
পুস্কর খীসা মিমো : রক্তে মিশে গেছে, তাই ছাড়তে পারি না। পারলে অনেক আগেই ছেড়ে দিতাম। মাঝে মাঝে সরকারের কাছে এদেশের হকি বন্ধের দাবি জানাতে মন চায়। এটার প্রতি যে আবেগ ভালোবাসা তাই ছাড়তে পারি না। জীবনের সব কিছু আমি এখানেই দিয়েছি। এটা ছাড়া আর কিছুই করিনি। হকি ছেড়ে অন্য কিছুতে গেলে আরও ভালো করতে পারতাম।

ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে এত হতাশ কেন?
মিমো : হতাশার অনেক কারণ। প্রথমত, খেলা নিয়মিত না হওয়ায় আমাদের চরম অর্থকষ্ট পোহাতে হয়। যেহেতু অন্য কিছু করিনি, শুধু খেলেছি, সেহেতু হকিই আমার একমাত্র জীবিকা। লিগ হয় না, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগও না। আগে ইউরোপে খেলার সুযোগ ছিল। এখন সেটাও হয় না। তাহলে আয়-রোজগার কীভাবে হবে? তবুও আবেগ-ভালোবাসা থেকে খেলি। লাল-সবুজের জন্য খেলি। অথচ প্রাপ্য সম্মানটাও জুটে না। আমাদের দেখে তরুণরাও এখন আর খেলাটার প্রতি আকৃষ্ট হয় না। তাহলে এই খেলা রেখে লাভ কী?

শুনলাম বাদ পড়া নিয়ে ফেডারেশন কর্তাদের সঙ্গে আপনাদের বেশ কজনের বড় ধরনের ঝামেলা হয়েছে?
মিমো : অনেক কিছুই হয়েছে। তার আগে কেন আমরা এএইচএফ কাপে খারাপ করেছি তার আসল কারণটা সবার জানা দরকার। 

বলুন কী হয়েছিল তখন? অধিনায়ক হিসেবে তো সব কিছুর চাক্ষুস আপনি—
মিমো : ইন্দোনেশিয়ায় খেলতে যাওয়ার প্রথম থেকেই সমস্যার শুরু হয়। সেই সফরে জাতীয় দলের ম্যানেজার ছিলেন ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক তপন ভাই (আবু জাফর তপন)। বিমানবন্দরে দেশ ছাড়ার আগে এক ইমিগ্রেশন অফিসার জাতীয় দলের সদস্যদের সঙ্গে খুব বাজে ব্যবহার করেছিলেন। আমরা যেন পাড়ার কোনো দল। দীর্ঘক্ষণ সারি করে দাঁড় করিয়ে রাখার পাশাপাশি অনেক বাজে ব্যবহার করেন। এ নিয়ে খেলোয়াড়দের সঙ্গে তর্কাতর্কি পর্যন্ত হয়। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব থাকে সব কিছু মসৃণভাবে সম্পন্ন করার। অথচ ম্যানেজার ও সহকারী ম্যানেজার এ ঘটনায় কিছুই করেননি। তাদের নীরব থাকতে দেখে সিনিয়র এক খেলোয়াড় রেগে গিয়ে অনেক কথা তাদের বলেছিলেন। সেই প্রতিশোধটাই মনে হয় ইন্দোনেশিয়া গিয়ে নিয়েছেন তপন। সেখানে প্রথম থেকেই আমাদের খাওয়ার কষ্ট দিয়েছেন। খাওয়ার অবস্থা ভালো ছিল না। একই খাবার ছিল প্রতি বেলায়। সেটাও পরিমাণে কম। প্রথম ম্যাচ আমরা না খেয়ে খেলেছি। খেলে এসে রাতে বলছিলাম খাবারের পরিমাণ বাড়াতে। কিন্তু একই খাবার রাতে দিয়েছে।

এ নিয়ে কিছু বলেননি ম্যানেজারকে?
মিমো : সবাই বলার পর আমি এটা নিয়ে কথা বলেছিলাম। উনারা বলছিল ম্যানেজ করো। বাইরে থেকে স্রেফ ভাত নিয়ে এসেছিল। তবে ভাত দিয়ে খাওয়ার মতো কিছু ছিল না। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই দিয়েছিল। এসব নিয়ে তর্ক হয়। আরেক দিনের কথা বলি। আমাদের খেলা ছিল সন্ধ্যা ৭টায়। দুপুরের খাবার খাওয়া হয় ১টায়। খেলার আগে তো লম্বা সময় থাকে, তখন কিছু একটা নাস্তা দিতে হয়। নাস্তা হিসেবে পেয়েছি শুধু একটা আপেল। এসব নিয়ে প্রায়ই তাদের বলতে হয়েছে। অনেক বলার পর জিজ্ঞেস করেছে কী খেতে চাও? আমি সবার মতামত নিয়ে বলেছিলাম বার্গার দেওয়ার জন্য নাস্তার সময়। এই বার্গার নিয়ে দেশে এসে খোঁটা শুনতে হয়েছে তাদের কাছ থেকে।

আগেও কি বিদেশে টুর্নামেন্ট চলাকালে এমন হয়েছে?
মিমো : আমরা আগেও তো ইন্দোনেশিয়ায় খেলেছি। ১৬-১৭ বছর ধরে জাতীয় দলে খেলছি। এর আগে খাওয়া নিয়ে কখনো অভিযোগ করতে হয়নি। দুই টুকরো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, একটা চিকেন ফ্রাই আর এক বাটি ভাত দিয়ে কী হয় বলেন।

খাবার নিয়ে দলের কোচ (মামুনুর রশীদ) কিছু বলেননি অফিশিয়ালদের?
মিমো : ইন্দোনেশিয়ায় হেড কোচ আর ম্যানেজারের মিল ছিল না। সত্যি হলো এই টুর্নামেন্টে কোনোরকম প্ল্যানিং ছাড়াই খেলেছি আমরা। সেমিফাইনালের আগের দিন প্র্যাকটিস বাদ দিয়ে রেস্ট ডে দেওয়া হয়। খেলোয়াড়দের শপিং করার টাইম দেওয়া হয়! ম্যানেজার অনুমতি না দিলে তো আর আমরা নিজে নিজে শপিং করতে যেতাম না। টিম হোটেলের লবিতে যে ঘটনা একদিন ঘটেছে, তাতে দেশের সম্মান মাটিতে লুটিয়েছে। ঘটনাটা জুতা নিয়ে। বাংলাদেশে থাকতে সহকারী ম্যানেজার বলেছিলেন, ভালো করলে আমাদের জুতা দেবে। আমরা বলছিলাম ভালো জুতা দিতে। বাজেটের বেশি হলে আমরা খেলোয়াড়রা বাড়তি টাকাটা দেব। জুতা মালয়েশিয়া থেকে একজন নিয়ে আসে হোটেলে। আমরা বাড়তি টাকা নিজেরা এক সঙ্গে করে রেখেছিলাম, চাইলে দেব বলে। জুতা যিনি নিয়ে এসেছিলেন, তিনি বিল চাচ্ছিলেন। মামুন স্যার তখন আমাদের বলেছেন, তোরা দিস না, টাকা ম্যানেজার দেবে। আমরা যে অতিরিক্ত দিতে চাচ্ছিলাম সেটা তখন দিইনি। এ নিয়ে লবিতে কোচ-ম্যানেজারের মধ্যে প্রকাশ্যে অনেক তর্ক হয়। 

তাহলে কি এ সবকিছুর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল খেলায়?
মিমো : সত্যি বলতে এগুলার প্রভাব পড়েছে। মাঠের বাইরে প্রতিনিয়ত ঘটা নানা ঘটনার জেরে আমরা আমাদের সেরাটা দিতে পারিনি। এরপর তো শুনেছি খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে ম্যানেজাররা রিপোর্ট দিয়েছেন। টুর্নামেন্ট চলাকালে পেছনে যে কী হয়েছে এগুলো তো আর কেউ জানে না। এখন বলছি, অনেকে মনে করতে পারেন বাদ পড়ে বলছি। আসলে দল থেকে বাদ পড়া নিয়ে আমাদের কোনো দুঃখ  নেই। যারা সুযোগ পেয়েছে তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিদায় নিয়েছি। মন থেকে দোয়া করছি যাতে দল ভালো করে। 

তাহলে আপনাদের ক্ষোভটা কোথায়?
মিমো : আমাদের মনে হয়েছে ফেয়ার সিলেকশন হয়নি। ওই (টুর্নামেন্ট চলাকালে ঘটনার) ক্ষোভটা দল নির্বাচনের সময় কাজ করেছে। 

দল ঘোষণার দিন কী কী হয়েছিল?
মিমো : দল ঘোষণার পর আমি, নাঈম, তার ছোট ভাই আবেদ সাধারণ সম্পাদকের কক্ষে গেলাম। বললাম (রিয়াজ) ভাই এই সিলেকশন ফেয়ার হয়নি। আমরা পারফর্ম করেও চান্স পেলাম না। কীসের ভিত্তিতে সিলেকশন করলেন? ব্যক্তিগত বিষয় আনা হয়েছে মনে হয়। তখন সাধারণ সম্পাদক যেন কিছুই জানেন না এমন ভাব করে উলটো আমার কাছে কী হয়েছে জানতে চাইলেন। আমরা সবশেষ টুর্নামেন্টে ঘটা সব কিছু বললাম। তখন রিয়াজ ভাই বললেন— না তো এমন কিছু হয়নি। আমাদের তো এমন কোনো রিপোর্ট দেয়নি ম্যানেজার!

তাহলে বাদ পড়েছেন কেন— এই প্রশ্ন করেননি?
মিমো : উনি বলেছেন এটা কোচ আর সিলেকশন প্যানেল জানে। তিনি বলেন, আমি এসব কিছু জানি না, আমি শুধু সিগনেচার করি। সিলেকশন কমিটি আর কোচ জানে। তখন তপন ভাই রুমে ঢুকছে।

তারপর...

মিমো : তপন ভাইকে এসব বলার পর তিনিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। আমি আর নাঈম নাকি ব্যস্ত ছিলাম আন্দোলনে— এ প্রশ্ন করার পর তিনি (তপন) উত্তেজিত হয়ে যান। তিনি নাঈমকে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দেন। এটা নিয়ে তখন ওইখানে গণ্ডগোল হয়েছে অনেক। একজন জয়েন্ট সেক্রেটারি কীভাবে গালি দিতে পারেন। 
 
পরে কী হলো?
মিমো : সেক্রেটারি পরে আমাদের কাছে বলেছেন তপন ভাইয়ের স্লিপ অব টাং হয়েছে। উনি মাফ চেয়েছেন তপন ভাইয়ের পক্ষ থেকে। জুতা মেরে গরু দান করা হয়েছে আমাদের। আমরা এর বিচার চাই। 

ফেডারেশন তো বলছে বাদ দেওয়া হয়েছে পারফরম্যান্স আর ফিটনেস ঘাটতির কারণে?
মিমো : ওরা বিস্তারিত কিছু বলেনি। বলছে ফিটনেস লেভেলের কথা। ১০ দিন ধরে একজন অনূর্ধ্ব-২১ বছর বয়সী খেলোয়াড় যেভাবে দৌড়াচ্ছে, আমিও সেভাবেই দৌড়াচ্ছি। ধরেন জুনিয়র আমার থেকে ১০০ মিটার আগে। ওরা নতুন আসছে, আর আমি ১৬ বছর ধরে খেলছি। আমার ১৯ হলে ওর ২০। আমার তো ১৪-১৩ না।

এই কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর একের পর এক সিনিয়র বাদ দেওয়ার পথে হাঁটছে। শুরু হয়েছিল জিমিকে দিয়ে। এখন আপনারা—
মিমো : আমাদের মনে হয় এই কমিটি না থাকলে ভালো। আমরা আগেও বলেছি, কমিটিতে যেই আসুক আমাদের মাঠে খেলা থাকতে হবে। আমরা খেলার মাঠে থাকতে চাই। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ, প্রিমিয়ার লিগ, ঘরোয়া লিগ থাকবে মাঠে। বর্তমান কমিটি এখন এসব কিছুই করেনি একটা বিজয় দিবস টুর্নামেন্ট ছাড়া। আগে ক্যাম্পে থাকলে ৫০০ টাকা করে পেতাম প্রতিদিন খরচ হিসেবে। এই কমিটি আসার পর ৪০০ টাকা করেছে। আগে ৫০০ পেতাম, বলার পর তপন ভাই বলেছেন তোমরা কি এই টাকা দিয়ে ফ্যামিলি চালাবা?

এত কিছুর পর সবাই কেন এক হয়ে প্রতিবাদ করছেন না?
মিমো : আসলে হকি খেলোয়াড়দের একটা বড় অংশ বিভিন্ন বাহিনীতে চাকরি করে। ফলে তারা চাইলেও অনেক কথা বলতে পারে না, প্রতিবাদ করতে পারে না। আমি, নাঈম আর আবেদ বাইরের। তাই কিছু করতে গেলে বাধাগ্রস্ত হই। সবাই আসতে ভয় পায়। যদি চাকরিতে কোনো ক্ষতি হয়। ওদের টাকা না দিলেও ওরা দলে আসতে বাধ্য। তবে আমার মনে হয় জাতীয় দলে থাকাবস্থায় অন্যায়ের প্রতিবাদ সবার করা উচিত।

আপনাদের তো কোনো বেতন বা চুক্তি নেই জাতীয় দলে খেলার ব্যাপারে?
মিমো : কোনো বেতন নেই। প্রতিদিনের যে খরচ সেটাও তো কমে গেল। বিদেশে খেলার সময় দৈনিক ১২ ডলার পেলে হিসাব করেন ১০ দিনের ট্যুর হলে ১২০ ডলার। অথচ আমাদের একটা কেডসের দামই ১৫০ ডলার। কেডস থেকে শুরু করে স্টিকসও নিজেদের টাকায় কিনতে হয়। কয়েকজনের স্পন্সর আছে। তবে সেই সংখ্যা হাতেগোনা।