মানুষের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে গাজায়

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। জাতিসংঘ সমর্থিত খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) প্রথমবারের মতো গাজা সিটি ও এর আশপাশের এলাকায় দুর্ভিক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল প্রকাশিত আইপিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার পরিস্থিতি ‘ফেজ ফাইভ’-এ পৌঁছেছে, যা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে বিপর্যয়কর পর্যায়। এই মানবসৃষ্ট বিপর্যয় শুধু খাদ্যের অভাব নয়, বরং মানুষের বেঁচে থাকার ব্যবস্থার ‘ইচ্ছাকৃত’ পতন।

আইপিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় ৫ লাখ ১৪ হাজারেরও বেশি মানুষ চরম অনাহার ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ এই সংকট দেইর আল-বালাহ ও খান ইউনিসে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যেখানে প্রায় ৬ লাখ ৪১ হাজার মানুষ একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ২২ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত ক্ষুধাজনিত কারণে কমপক্ষে ২৭১ জন ফিলিস্তিনি মারা গেছেন, যার মধ্যে ১১২ জন শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায়ই এক শিশুসহ ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া, ইসরায়েলি হামলায় ৬২ হাজার ১২২ জন নিহত এবং ১ লাখ ৫২ হাজার ৩৫৯ জন আহত হয়েছেন।

গাজার মোট জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশ বা ১০ লাখ ৭ হাজার মানুষ ‘ফেজ ফোর’-এ রয়েছেন, যারা জরুরি খাদ্য সংকটে ভুগছেন। আরও ৩ লাখ ৯৬ হাজার মানুষ ‘ফেজ থ্রি’-তে আছেন, যারা খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে। আইপিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন নাগাদ তীব্র অপুষ্টির কারণে ৫ বছরের কম বয়সী ১ লাখ ৩২ হাজার শিশুর মৃত্যু হতে পারে। অঞ্চলটিতে ৫৫ হাজার ৫০০ গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীর জরুরি পুষ্টি সহায়তার প্রয়োজন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুলাই মাস থেকে ১২ হাজারেরও বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে; যাদের প্রতি চারজনের মধ্যে একজনের অবস্থা মারাত্মক।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই দুর্ভিক্ষকে ‘মানবসৃষ্ট বিপর্যয়’ এবং ‘মানবতার ব্যর্থতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি শুধু খাদ্যের অভাব নয়, মানুষের বেঁচে থাকার ব্যবস্থার ইচ্ছাকৃত পতন।’

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক সতর্ক করে বলেছেন, এই অনাহারে মৃত্যু যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। জাতিসংঘের চারটি সংস্থা এফএও, ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) যৌথ বিবৃতিতে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে।

ইসরায়েল অবশ্য আইপিসির প্রতিবেদনকে ‘হামাসের মিথ্যাচার’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, গাজায় পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।

তবে জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থা অভিযোগ করেছে, ইসরায়েলের কঠোর অবরোধ ও সামরিক অভিযানের কারণে ত্রাণ বিতরণ ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গাজার ৯০ শতাংশ বাড়িঘর ধ্বংসপ্রাপ্ত, স্বাস্থ্যসেবা ও পানি-স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

আইপিসির দুর্ভিক্ষ পর্যালোচনা কমিটি (এফআরসি) বলছে, দুর্ভিক্ষ শুধু টিকে নেই, বরং আরও তীব্র ও বিস্তৃত হচ্ছে।

আইপিসি সতর্ক করেছে, তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না নিলে এই মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে। ত্রাণ প্রবাহে অবাধ প্রবেশাধিকার, যুদ্ধবিরতি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা এখন জরুরি। গাজার পরিস্থিতি এখন ‘পরম পরাজয়ের’ স্তরে পৌঁছেছে, যা বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

গুতেরেস বলেন, ‘আমরা এই পরিস্থিতিকে দায়মুক্তি দিয়ে চলতে দিতে পারি না। পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনই।’