কোরআন-হাদিসই মুসলিম সংস্কৃতির মূলভিত্তি

সংস্কৃতি হলো মানুষের জীবনধারার বহিঃপ্রকাশ, যা ভাষা, সাহিত্য, শিল্পকলা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, উৎসব, সামাজিক রীতি ও আচরণে প্রতিফলিত হয়। সেকুলার বা তথাকথিত প্রগতিশীলদের দৃষ্টিতে ধর্মাচার ও সংস্কৃতি আলাদা বিষয়। তারা সংস্কৃতিকে ধর্মের বাইরেই জ্ঞান করে। কিন্তু কোরআন-হাদিসের শিক্ষা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে মানুষের প্রতিটি কাজ, ইবাদত, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, সামাজিক আচরণ সবই আল্লাহর নির্দেশের আলোকেই পরিচালিত হওয়া আবশ্যক। আর মহান আল্লাহর সেই বিধিবিধানের নামই ইসলাম। অতএব মুসলামানদের সংস্কৃতি কখনো ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। বরং ইসলামই মুসলিম সংস্কৃতির মূলভিত্তি। সংস্কৃতির নামে ইসলামবহির্ভূত কোনো কাজ মুসলমানদের করার অবকাশ নেই। কোরআনের আলোকে মুসলিম সংস্কৃতির নানা দিক উল্লেখ করা হলো।

মানবজাতির সৃষ্টির উদ্দেশ্য : মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আমি জিন ও মানুষ জাতিকে শুধু আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা জারিয়াত ৫৬)

ইবনে কাসির এর ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ‘আল্লাহ মানুষ ও জিনকে সৃষ্টি করেছেন কেবল তার ইবাদতের জন্য। ইবাদত শুধু নামাজ বা রোজা নয়, বরং মানুষের প্রতিটি কর্মকাণ্ড আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হলে সেটিই ইবাদত।’ এমন ইমানি কর্তব্যবোধ থেকেই খাদ্যাভ্যাস, লেবাস-পোশাক, সামাজিক রীতি, রাষ্ট্রীয় আচার সবকিছুতেই মহান আল্লাহর হুকুম মেনে চলা অপরিহার্য।

হালাল-হারামের বিধান : মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘হে মানুষ! তোমরা পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে তার মধ্যে থেকে হালাল ও পবিত্র জিনিস আহার করো।’ (সুরা বাকারা ১৬৮)

কুরতুবি উল্লেখ করেছেন যে, খাদ্যসংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাস ইসলামের হালাল-হারাম বিধান দ্বারা নির্ধারিত। তাই মুসলিম সমাজের খাদ্যাভ্যাসের সংস্কৃতিও ইসলামের আলোকেই চর্চিত হতে হবে। খাবারের ক্ষেত্রে যাবতীয় হারাম পদ্ধতি ও দ্রব্য বর্জন করা এবং হালাল পদ্ধতি অবলম্বন, হালাল রিজিক আহরণ ও গ্রহণ করাই মুসলমানদের খাদ্যসংস্কৃতি।

পোশাক ও শালীনতা : কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে আদম সন্তান! আমি তোমাদের জন্য এমন পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আচ্ছাদিত করে এবং অলঙ্কারস্বরূপ। আর তাকওয়ার পোশাকই উত্তম।’ (সুরা আরাফ ২৬)

ইমাম তাবারি (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, মহান আল্লাহ মানবজাতিকে শারীরিক লজ্জাস্থান আড়াল করার জন্য পোশাক দিয়েছেন এবং আধ্যাত্মিক সততার জন্য তাকওয়ার পোশাকও দিয়েছেন। অর্থাৎ পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও ইসলামের নীতিনির্দেশ মেনে চলাটাই মুসলমানদের

সংস্কৃতি। হাদিসের আলোকে মুসলিম সংস্কৃতির নানা দিক উল্লেখ করা হলো।

আচার-আচরণ ও নৈতিকতা : রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র উত্তম।’ (সহিহ বুখারি)

এ হাদিস নির্দেশ করে, সংস্কৃতির মূল উপাদান হলো আখলাক বা নৈতিকতা। অতএব উত্তম চরিত্র ও আচার-আচরণের মাধ্যমেই ইসলামি সংস্কৃতি সমাজে প্রতিফলিত হয়।

দৈনন্দিন কাজও ইবাদত : রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন খাওয়া-দাওয়া করবে, আল্লাহর নাম নেবে।’ (সহিহ মুসলিম)

এ হাদিসের নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, সংস্কৃতির ক্ষুদ্রতম দিক, যেমন খাদ্যাভ্যাসও ইসলামের নির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত।

উৎসব ও সামাজিক রীতি : আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) মদিনায় গিয়ে দেখলেন মানুষ দুটি উৎসব পালন করছে। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদের দুটি দিন দিয়েছেন, যা (অন্য সব উৎসব দিনের চেয়ে) উত্তম। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।’ (আবু দাউদ)

এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, ইসলামের নির্দেশনার আলোকে উৎসবগুলোও পালিত হওয়া সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। উৎসব-আমেজের নামে ইসলামবিরোধী কোনো কাজ মুসলিম সংস্কৃতি হতে পারে না, বরং তা আল্লাহর নাফরমানি।

মুসলিম সংস্কৃতির সব উপাদান যেমন খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, আচার-আচরণ, উৎসব, শিল্পকলা ইত্যাদি ইসলামের আলোকে পরিচালিত। ধর্মহীন সংস্কৃতি নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা শূন্য, যা সমাজে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার কারণ হতে পারে। ইসলামে সংস্কৃতি মানে হলো আল্লাহর নির্দেশিত জীবনপদ্ধতি, যা ব্যক্তি ও সমাজকে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি প্রদান করে।

পবিত্র কোরআন ও হাদিস প্রমাণ করে যে, মুসলিম উম্মাহর সংস্কৃতি কখনো ইসলাম থেকে পৃথক হতে পারে না। কোরআন-সুন্নাহর আলোকেই মুসলিম জীবনধারা পরিচালিত

হবে। এটিই মুসলিম সভ্যতা-সংস্কৃতি। আর ইসলামবিহীন সংস্কৃতি শেকড়বিহীন বৃক্ষের মতোই।