নতুন উত্তেজনায় দুই কোরিয়া

চিরবৈরী দুই প্রতিবেশী উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সীমান্তে গোলাগুলি নিয়ে সম্প্রতি নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা সীমান্তের কাছে উত্তর কোরিয়ার সৈন্যদের লক্ষ্য করে সতর্কতামূলক গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ জানানোর পরদিনই নতুন করে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে পিয়ংইয়ং। দেশটির নেতা কিম জং উনের তত্ত্বাবধানে গত শনিবার ওই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ)। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ক্রুজ মিসাইল, ড্রোনসহ অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম বলেও উল্লেখ করেছে কেসিএনএ। সংবাদমাধ্যমটির খবরে বলা হয়েছে, ‘অনন্য প্রযুক্তি’ ব্যবহার করে ‘উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন’ ওই দুটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হয়েছে। তবে এর বাইরে ক্ষেপণাস্ত্র দুটি সম্পর্কে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংবাদ সংস্থাটি।

কেসিএনএ আরও বলেছে, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি আকাশসীমায় লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে অত্যন্ত কার্যকর। কেসিএনএর প্রকাশিত কয়েকটি ছবিতে দেখা গেছে, আকাশে ছুটে গিয়ে একটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে ক্ষেপণাস্ত্র। অন্য এক ছবিতে দেখা যায়, একজন সামরিক কর্মকর্তা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ নিয়ে কিম জং উনকে বিস্তারিত জানাচ্ছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তর কোরিয়া ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের জন্য নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করছে। এমন একটি সময় উত্তর কোরিয়া এসব ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালাল যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় ধরনের যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। ওই সামরিক মহড়া শুরু হওয়ার এক দিনের মধ্যেই উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া সীমান্তে গুলির ঘটনা ঘটেছে। ওই ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও সিউলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের  ‘ইচ্ছাকৃত উসকানি’ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে পিয়ংইয়ং। জাতিসংঘের বরাত দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপের খবরে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার প্রায় ৩০ জন সেনা সীমান্তের  ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ অতিক্রম করায় দক্ষিণ কোরিয়ার সৈন্যরা গুলি ছুড়েছে। পরে দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকেও নিশ্চিত করেছে যে, উত্তর কোরিয়ার সেনারা নিজেদের সীমান্ত অতিক্রম করে ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ ঢুকে পড়ায় সতর্কতা হিসেবে তাদের সৈন্যরা গুলি নিক্ষেপ করে।

এদিকে, আগামী আজ ওয়াশিংটনে এক শীর্ষ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের সাক্ষাতের কথা রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট লি দুই কোরিয়ার মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে বেশ আগ থেকেই প্রচার চালিয়ে আসছেন। তবে কিমের বোন অবশ্য লি সরকারের এই পুনর্মিলন প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উন নিজেও চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার নিন্দা জানিয়ে সেটিকে ‘সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। সেই সঙ্গে, নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে পৌঁছানোর অঙ্গীকারও করেন তিনি।

গত জানুয়ারিতে হাইপারসনিক ওয়ারহেডসহ নতুন একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় উত্তর কোরিয়া। ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম বলে দাবি করেছে দেশটি। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়াকে সমর্থন দিয়ে সৈন্য পাঠানোর বিনিময়ে উত্তর কোরিয়ার সরকার রুশদের কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি পেয়েছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে মস্কোর কাছ থেকে পিয়ংইয়ং ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে বলে গত বছর দাবি করেছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইউলের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিন ওনসিক। এরপর বেশ কয়েক দফায় উত্তর কোরিয়াকে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালাতে দেখা গেছে। তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে আসলেই রুশ প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে কি না, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বিরোধ বহু দিনের। অতীতে একসঙ্গে থাকলেও কোরীয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৫৩ সালে কোরিয়া ভেঙে দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হয়। এরপর দক্ষিণ কোরিয়া গণতন্ত্রের পথে হাঁটলেও, উত্তর কোরিয়া চলে যায় একনায়কতান্ত্রিক শাসকের হাতে। বর্তমানে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে দমনমূলক রাষ্ট্রগুলোর একটি, যেখানে কিম ও তার পরিবারের হাতে গত কয়েক দশক ধরে দেশটির শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে আছে। দশকের পর দশক ধরে বিরোধ চলার পরও দুই কোরিয়ার মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। ফলে মাঝেমধ্যেই দুদেশের মধ্যে উত্তেজনা ছড়াতে দেখা যায়।