বয়স্কদের যোগব্যায়াম

বার্ধক্য মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ এবং অবশ্যম্ভাবী পর্যায়। বার্ধক্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানারকম অসুখ এবং চিকিৎসা। অসুস্থতার প্রধানত মানুষের মানসিক সমস্যা এবং শারীরিক রোগ প্রতিরোধ করার অভাব। অল্পবয়সে অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং অন্যান্য কারণের জন্য একজন মানুষের বৃদ্ধ বয়সে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন কার্ডিওভাস্কুলার সমস্যা, টাইপ টু ডায়াবেটিস মেলিটাস (টিটুডিএম), ক্যানসার, ওবেসিটি এবং আর্থ্রারাইটিস প্রভৃতি দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া আরও রয়েছে মনোরোগ, যেমন অবসাদ এবং ডিমেনশিয়া, অন্যান্য শারীরিক জটিলতা, যেমন ব্যথা-বেদনা, ক্লান্তবোধ করা, হাঁটাচলা করার সীমাবদ্ধতা ও ঘুমের সমস্যা। বয়স্ক মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অবনতি ঘটায়।

যোগব্যায়ামের কার্যকারিতা

যোগব্যায়াম অনুশীলনের ফলে একজন বয়স্ক মানুষের শারীরিক এবং মানসিক অবস্থার উন্নতি হয়। তাই যোগচর্চা বয়স্ক মানুষের জীবনে খুবই কার্যকর। যোগব্যায়াম অনুশীলনের মাধ্যমে হাঁটাচলার শক্তি, শারীরিক ভারসাম্যতা, নমনীয়তা এবং মেজাজ-মর্জির উন্নতি ঘটে। নিয়মিত যোগচর্চার ফলে বৃদ্ধ মানুষের গুরুতর মানসিক এবং শারীরিক সমস্যার সমাধান ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।

যোগব্যায়াম মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি

বার্ধক্যে যে অবসাদ দেখা দেয় তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বার্ধক্যের লক্ষণগুলোর সঙ্গে অবসাদের লক্ষণ মিলেমিশে যায়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বয়স্ক মানুষদের মধ্যে শতকরা ১৬.৫ শতাংশের ক্ষেত্রে মানসিক অবসাদের ঝুঁকি প্রবল। পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যেই অবসাদের প্রবণতা বেশি থাকে। অবসাদগ্রস্ত মানুষের শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যায়। এই হরমোনের মাত্রা কমানোর জন্য একজন অবসাদগ্রস্ত বয়স্ক মানুষ যদি তিন মাস যোগব্যায়াম সঠিকভাবে অনুশীলন করেন তবে সুফল পাবেন।

বার্ধক্য সময়কালীন জীবনযাপনের ক্ষেত্রে যোগব্যায়াম নানাভাবে সুফল দেয়।  আমাদের মস্তিষ্ক থেকে নিউরো-প্রোটেক্টিভ রাসায়নিক পদার্থ হিসেবে যে নিউরো ট্রপিক ফ্যাক্টর (বিডিএনএফ) নির্গত হয়, যা আমাদের মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস অঞ্চলে সক্রিয় থাকে, সেই বিডিএনএফের মাত্রা একজন অবসাদগ্রস্ত মানুষের ক্ষেত্রে অনেক কম পরিমাণে নির্গত হয়। অবসাদগ্রস্ত মানুষের ক্ষেত্রে তিন মাস যোগাসন ও প্রাণায়াম অনুশীলনের দ্বারা এই বিডিএনএফের মাত্রা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়। বয়স্কদের স্মৃতিশক্তির দুর্বলতাও হ্রাস করা সম্ভব হয় যোগচর্চা এবং মেডিটেশনের মাধ্যমে।

হাঁটাহাঁটির তুলনায় বয়স্করা যদি আট সপ্তাহ যোগব্যায়াম অনুশীলন করেন তাহলে ওজন এবং কোমরের পরিধি কমার সুফল পাবেন। অন্যদিকে যোগচর্চার ফলে টাইপ টু ডায়াবেটিস মেলিটাস (টিটুডিএম)-এর মতো অসুখের ঝুঁকি কমে। বয়স্ক নারীদের অন্যতম সমস্যা হলো আর্থ্রাইটিস। এক্ষেত্রে যদি কয়েক বছর ধরে নিয়মিত যোগব্যায়াম অনুশীলন করা যায় তাহলে বাতের ব্যথা কমে, অতিরিক্ত শক্তি পাওয়া এবং অনিদ্রাজনিত সমস্যার উন্নতি হয়। নিয়মিত যোগব্যায়াম অনুশীলন আর্থ্রাইটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

চল্লিশ বছর বা তার বেশি বয়সের মহিলাদের আর একটি সমস্যা হলো প্রস্রাবের বেগ ধরে রাখতে না পারা বা মূত্রথলির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা। চল্লিশ বছরের আশপাশে থাকা মহিলাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে এই সমস্যা দেখা যায়। সমস্যা দূর করার জন্য ছয় সপ্তাহ ধরে যোগব্যায়াম অনুশীলনের মধ্য দিয়ে কার্যকর ফলাফল পাওয়া যায়।

যোগব্যায়াম করার আগে

 যদি কারোর শরীরের কোনো অংশে কাটাছেঁড়া বা অপারেশন হয় তাহলে ছয় মাস পর্যন্ত যেকোনো রকম যোগব্যায়াম এড়িয়ে চলা উচিত। এ সময়ে শুধু প্রশিক্ষকদের অধীনে প্রাণায়াম এবং সুকশ্মা ভায়ায়ামা নামক হালকা যোগব্যায়াম করতে পারেন।

 যাদের হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে, তাদের দ্রুত হারে  আসানাস এবং প্রাণায়াম বাদ দিতে হবে। এই দুটো আসন তারা আস্তে আস্তে করবেন।

 যোগ শিক্ষকের কাছে অস্থিসন্ধির ব্যথা, আর্থ্রাইটিসের সমস্যা বা কোনো শারীরিক সমস্যা এবং দুর্বলতার বিষয়ে সঠিক তথ্য জানাতে হবে। কোনো কোনো যোগব্যায়াম উপকারী সে বিষয়ে সঠিক পরামর্শ দেবেন। প্রশিক্ষকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে কোনো ধরনের যোগব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকতে হবে।