জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১১ সেপ্টেম্বর। কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টি পদের বিপরীতে ১৭৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে গতকাল শনিবার নতুন তিনটি প্যানেলসহ এখন পর্যন্ত আটটি প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও বাগছাস সমর্থিত আলাদা তিনটি, প্রগতিশীলদের আলাদা তিনটি (ছাত্র ইউনিয়নের অংকুর-অর্ক অংশসহ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন, ছাত্র ইউনিয়নের ইমন-তানজিম অংশসহ ছাত্রফ্রন্টের একাংশ এবং ছাত্রফ্রন্টের আরেক অংশ) এবং জিতু-শাকিল ও মেঘের নেতৃত্বে আলাদা স্বতন্ত্র দুটি প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে।
প্যানেলের বাইরেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন অনেকেই। গতকাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্প পরিসরে প্রচারণা শুরু করেছেন প্রার্থীরা। বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীদের দলবদ্ধভাবে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে দেখা যায়। এককভাবেও প্রচারণা করেছেন অনেকে। কেউ কেউ আবার লিফলেট বিতরণ করেছেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রফ্রন্টের একাংশের সংশপ্তক প্যানেল : গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলন করে ‘সংশপ্তক পর্ষদ’ নামে পাঁচ সদস্যের আংশিক প্যানেল ঘোষণা করেছেন ছাত্র ইউনিয়ন (ইমন-তানজিম) ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের একাংশের নেতাকর্মীরা। প্যানেলে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি (একাংশ) জাহিদুল ইসলাম ঈমন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) মনোনয়ন পেয়েছেন ছাত্রফ্রন্টের একাংশের সংগঠক সোহাগী সামিয়া জান্নাতুল ফেরদৌস।
এ ছাড়া তথ্য-প্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক সৈয়দ তানজিম আহমেদ, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে তানজিল আহমেদ এবং সহ-সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক (নারী) পদে সাদিয়া ইমরোজ ইলা মনোনয়ন পেয়েছেন।
জাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টি পদের মধ্যে পাঁচটি পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে তারা। এর মধ্যে দুজন নারী প্রার্থী রয়েছেন। প্যানেল ঘোষণার আগে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদপ্রার্থী সোহাগী সামিয়া বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম প্রগতিশীল ও মুক্তমনা সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৃহৎ জোট গঠন করে প্যানেল ঘোষণা করার, কিন্তু বিভিন্ন সংগঠনের দলীয় সংকীর্ণতা, দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা এবং জনতুষ্টিমূলক চিন্তা-ভাবনার কারণে তা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রফ্রন্টের সমর্থিত কয়েকটি পদে আমরা প্রার্থিতা ঘোষণা করেছি।’
‘স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ’ প্যানেল : বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে ‘স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ’ নামে আট সদস্যের একটি স্বতন্ত্র প্যানেল ঘোষণা করা হয়। এ প্যানেলে সহসভাপতি প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের একাংশের মুখপাত্র মো. মাহফুজুল ইসলাম মেঘ। এ ছাড়া প্যানেলে সহ-সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) পদে মো. নাজমুল ইসলাম, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে সৈয়দা মেহের আফরোজ শাঁওলি, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে সাহিদুল ইসলাম শিমূল, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে সাদিয়া রহমান মোহনা, সহ-সাংস্কৃতিক পদে শেখ আল ইমরান, নাট্য সম্পাদক পদে তপু চন্দ্র দাস, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে শাশ্বত পিকে।
প্যানেল ঘোষণা শেষে শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক প্রার্থী সৈয়দা মেহের আফরোজ শাঁওলি বলেন, ‘আমরা অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। এরপর যাদের সঙ্গে আমাদের চিন্তাধারা এবং উদ্দেশ্য মিলেছে তারা একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যদিও আমরা ইতিমধ্যে প্যানেল ঘোষণা করে ফেলেছি, কিন্তু এরপরেও যদি কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী আমাদের কাছে আসেন এবং আমাদের চিন্তাধারাকে তারা গ্রহণ করেন তাহলে আমরা তাদেরও আমাদের প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করব।’
তাদের প্যানেলের এজিএস (পুরুষ) প্রার্থী নাজমুল ইসলাম বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) জাবি শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। গত ২১ আগস্ট রাতে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বাগছাস থেকে পদত্যাগ করেন।
নাজমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই প্যানেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য রয়েছেন যারা বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে ন্যায্য আন্দোলন-সংগ্রামে কাজ করেছেন। এই প্যানেলের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমি আগামীতে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যেতে পারব বলে মনে করি।’
ছাত্রফ্রন্টের আংশিক প্যানেল : গতকাল রাত ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সংবাদ সম্মেলন করে তিন সদস্যের আংশিক প্যানেল ঘোষণা করেছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্কসবাদী) জাবি শাখা। ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির স্কুলবিষয়ক সম্পাদক দীপা মজুমদার প্যানেল ঘোষণা করেন।
প্যানেলে সহ-সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) প্রার্থী হিসেবে আছেন ছাত্রফ্রন্ট (মার্কসবাদী) জাবি শাখার একাংশের সংগঠক মো. সজিব আহম্মদ জেনিচ। এ ছাড়া কার্যকরী সদস্য (নারী) পদে রোকেয়া আমিন অনুসূয়া এবং কার্যকরী সদস্য পুরুষ পদে মো. সুমন হোসেন মনোনীত হয়েছেন।
প্যানেল ঘোষণা শেষে সহ-সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) প্রার্থী মো. সজিব আহম্মদ জেনিচ বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষে কাজ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সোচ্চার থেকেছি। আমরা নির্বাচনে জিততে পারি বা না পারি, আমরা আগামীতেও কাজ করে যাব। শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান থাকবে, যারা যোগ্যতা রাখে এবং শিক্ষার্থীদের কথা ও মতামত তুলে ধরবে তাদের ভোট দেবেন।’
আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু প্রার্থীদের : জাকসুর আচরণবিধি অনুযায়ী প্রার্থীরা ২৯ আগস্ট বিকেল ৪টা থেকে ৯ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা পর্যন্ত প্রচারণা করতে পারবেন। ২৯ আগস্ট বিকেল ৪টার পর থেকে প্রচারণা শুরু হলেও গতকাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্প পরিসরে প্রচারণা শুরু করেছেন প্রার্থীরা। গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকা থেকে প্রচারণা শুরু করেন শাখা ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী মো. শেখ সাদী হাসান ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী তানজিলা হোসাইন বৈশাখীসহ অন্য প্রার্থীরা। সেখান থেকে তারা আ ফ ম কামালউদ্দিন হলের সামনে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে তাদের কাছে নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এরপর মুরাদ চত্বরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন প্রার্থীরা। এ সময় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর ও সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনীক তাদের সঙ্গে যুক্ত হন।
ছাত্রদল প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী তানজিলা হোসাইন বৈশাখী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দুপুর থেকে প্রচারণা শুরু করি। বটতলা ও মুরাদ চত্বর এলাকার সড়কসহ আরও কয়েকটি সড়কে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করি। আমি আশাবাদী, আমিসহ আমার প্যানেলের সবাই নির্বাচনে জয়লাভ করব।’
বিকেল ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় বটতলা থেকে সংঘবদ্ধভাবে প্রচারণা শুরু করেন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ সমর্থিত শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম প্যানেলের প্রার্থীরা। তারা মুরাদ চত্বরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের হলগুলোর সামনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং লিফলেট বিতরণ করেন। তাদের প্যানেলের সহসভাপতি পদপ্রার্থী আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে আমরা সকাল থেকে প্রচারণা ভালোভাবে করতে পারিনি। বিকেলে আমরা প্রচারণার জন্য বের হই।’
সন্ধ্যার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে প্রচারণা করেন শাখা ছাত্রশিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট প্যানেলের প্রার্থীরা। এ প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী মাজহারুল ইসলাম বলেন, প্রার্থীরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে হলগুলোতে প্রচারণা করেছে। ছাত্রীদের হলগুলোতে নারী প্রার্থীরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন।
সন্ধ্যার পর থেকে আংশিকভাবে প্রচারণা শুরু করেছেন প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেলের নারী প্রার্থীরা। এ প্যানেলের সহসভাপতি পদপ্রার্থী অমর্ত্য রায় জন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আগামীকাল (আজ) থেকে পুরোদমে প্রচারণা শুরু করব। আজকে (গতকাল) সন্ধ্যার পর থেকে শুধু নারী প্রার্থীরা প্রচারণা করেছেন।’