এবার শিপিং খাতে ওয়াচম্যান বিতর্ক

শিপিং খাতে বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ বৃদ্ধি ও বিকডার বর্ধিত চার্জ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই নতুন করে উঠে এসেছে ওয়াচম্যান ইস্যু। চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ বন্দরের সীমানায় আগত সব জাহাজে ওয়াচম্যান নিয়োগ বাধ্যতামূলক করায় এ বিপত্তি দেখা দিয়েছে। শুধু বাধ্যতামূলকই নয়, এদের মজুরিও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ওয়াচম্যান নিয়োগ নিশ্চিত না হলে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ প্রবেশের অনাপত্তিপত্র দেওয়া হবে না বলেও নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের পরিচালক (নিরাপত্তা) দপ্তর থেকে গত ১৮ আগস্ট এক আদেশে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বার্থসহ বহির্নোঙ্গরে আগত সব বাণিজ্যিক জাহাজে চুরি, ডাকাতি ও জলদস্যুতা প্রতিরোধে ওয়াচম্যান সেল থেকে ওয়াচম্যান নিতে হবে। নিবন্ধিত, প্রশিক্ষিত ও পরিচয়পত্রধারী ওয়াচম্যানদের দৈনিক মজুরি দিতে হবে। সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ওয়াচম্যান নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এদিকে, বন্দর কর্র্তৃপক্ষের এই আদেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রতিবাদ জানিয়েছে। গত ২৫ আগস্ট তারা চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের পরিচালক (নিরাপত্তা) বরাবর চিঠি দিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এভাবে হঠাৎ ওয়াচম্যান নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা যায় না। চট্টগ্রাম বন্দর নিরাপত্তার দিক থেকে সিকিউরিটি লেভেল-১ মাত্রার, যেখানে চুরি বা ডাকাতি হয় না।’ এ ছাড়া, নিরাপত্তার জন্য নৌসীমায় নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড রয়েছে।

তাহলে ওয়াচম্যান বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজন কী? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘ওয়াচম্যান নিয়োগের বিষয়ে সরকারি কোনো গেজেট নেই, এমনকি এটি বন্দরের ট্যারিফের আওতায়ও পড়ে না। তাই এভাবে বাধ্যতামূলক করলে জাহাজ কোম্পানিগুলো থেকে ওয়াচম্যানের জন্য অর্থ আদায় করা যাবে না।’

ওয়াচম্যান কেন প্রয়োজন?

শিপিং খাতের একাধিক প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাহাজে চুরি ও ডাকাতি প্রতিরোধে কিছু লোক নিয়োগ করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের নিবন্ধিত ভেন্ডর থেকে এসব লোক জাহাজে বাইরে থেকে কেউ উঠে চুরি বা ডাকাতি করছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করে। তাদের ওয়াচম্যান বলা হয়। কিন্তু এতে সমস্যা কোথায়? এ বিষয়ে শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, ‘এসব ওয়াচম্যানকে বন্দর থেকে নিয়ে যাওয়া এবং জাহাজে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার সুযোগ নেই। তাই আমরা এটি নিরুৎসাহিত করি। তবুও, যেসব জাহাজে প্রয়োজন হয়, আমরা ভেন্ডর থেকে ওয়াচম্যান নিয়ে থাকি।’

ওয়াচম্যান বাধ্যতামূলক করার কারণ কী? এ প্রশ্নের উত্তরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে আগত সব বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তার স্বার্থে আইএসপিএস কমপ্লায়েন্স (আন্তর্জাতিক জাহাজ ও বন্দর নিরাপত্তা বৃদ্ধির শর্তাবলি) মেনে চলতে নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ওয়াচম্যান নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।’

 এ বিষয়ে বাংলাদেশ নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারী বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় তিনটি জাহাজে চুরির ঘটনা ঘটেছে। এতে আন্তর্জাতিকভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্দরের সুনাম অক্ষুণœ রাখতে এবং জলসীমায় চুরি বা ডাকাতির ঘটনা রোধে আইএসপিএস কোড অনুযায়ী ওয়াচম্যান নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

 শিপিং এজেন্টরা বলছেন, বন্দরের সীমানায় পাহারার জন্য কোস্ট গার্ড রয়েছে। তবুও ওয়াচম্যানের প্রয়োজন কেন? এ প্রশ্নের জবাবে মো. শফিউল বারী বলেন, ‘প্রতিটি জাহাজের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য ওয়াচম্যান প্রয়োজন। কোস্ট গার্ড জলসীমায় পাহারা দেয়, কিন্তু ওয়াচম্যান প্রতিটি জাহাজের জন্য পৃথকভাবে থাকবে।’

ওয়াচম্যানের কাজ কী?

জাহাজে ওয়াচম্যান কী কাজ করে এবং তা পর্যাপ্ত কি না? এ প্রশ্নের উত্তরে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের নিরাপত্তা বিভাগের আওতায় একটি ওয়াচম্যান সেল গঠন করা হয়েছে। এই সেলে প্রাইভেটভাবে ওয়াচম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের পরিচয়পত্রও রয়েছে। বন্দরে আগত সব বাণিজ্যিক জাহাজে ওয়াচম্যান নিয়োগের বিষয়টি এই সেল মনিটরিং করবে। কোনো জাহাজ ওয়াচম্যান নিয়োগ না করলে সেটি নৌবাণিজ্য অধিদপ্তর থেকে অনাপত্তিপত্র পাবে না।

ওয়াচম্যানের কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘কোনো জাহাজে কেউ চুরি করছে কি না, জাহাজের রশি বা অন্য কিছু চুরি বা ডাকাতির উদ্দেশ্যে উঠতে চাচ্ছে কি না, এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করবে। অর্থাৎ, বন্দর সীমানায় প্রবেশের পর থেকে পুরো সময় পাহারা দেবে এসব ওয়াচম্যান। জাহাজের আকার অনুযায়ী ওয়াচম্যানের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়।’

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দরে ৩০টি শিপিং কোম্পানির জাহাজ চলাচল করে। এসব জাহাজ নিয়মিত বন্দরে আসা-যাওয়া করে। গত মাসে বন্দরে ১১৩টি, মে মাসে ১২৬টি, এপ্রিলে ১২২টি এবং মার্চে ১১৫টি কনটেইনার জাহাজ ভিড়েছে। এসব জাহাজের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ হ্যান্ডলিং করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার কনটেইনার এবং ১৩ কোটি মেট্রিক টন কার্গো পণ্য হ্যান্ডলিং করা হয়েছে।