বিশ্বের প্রথম ইউনিভার্সাল ৬-জি চিপ আনছে চীন

গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের মধ্যেকার ডিজিটাল বিভাজন ঘুচিয়ে দিতে যুগান্তকারী এক আবিষ্কারের পথে হাঁটছে চীন। দেশটির বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন বিশ্বের প্রথম ‘অল-ফ্রিকোয়েন্সি’ সিক্স-জি চিপ, যা দূরবর্তী অঞ্চলেও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম। ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি পুরো ওয়্যারলেস স্পেকট্রাম জুড়ে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ গিগাবিটের বেশি মোবাইল ইন্টারনেট গতি সরবরাহ করতে সক্ষম। এর বিশেষত্ব হলো, প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার জন্য ব্যবহৃত ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডগুলোকেও এটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবে। সহজভাবে বলতে গেলে, এই চিপের সাহায্যে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি ৫০ জিবির উচ্চমানের এইট-কে রেজ্যুলেশনের চলচ্চিত্র ডাউনলোড করা সম্ভব হবে।

কিছু ৫ জি মোবাইল ফোন প্রায় ৩ গিগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতে কাজ করে, যেখানে স্যাটেলাইট যোগাযোগের জন্য ৩০ গিগাহার্টজ পর্যন্ত ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করা হয়। ভবিষ্যতে হলোগ্রাফিক সার্জারির মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জন্য ১০০ গিগাহার্টজ পর্যন্ত ফ্রিকোয়েন্সি প্রয়োজন হতে পারে। এতদিন প্রকৌশলীদের প্রতিটি নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আলাদা আলাদা সমাধান তৈরি করতে হতো। তবে পিকিং ইউনিভার্সিটি এবং সিটি ইউনিভার্সিটি অব হংকং-এর বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে গঠিত গবেষক দল এই খণ্ড খণ্ড সমাধানের প্রয়োজনীয়তা দূর করতে পারে। তারা দাবি করেছেন, ০. ৫ গিগাহার্টজ থেকে ১১৫ গিগাহার্টজ পর্যন্ত পুরো ওয়্যারলেস স্পেকট্রামকে একটি আঙুলের নখের সমান চিপে সফলভাবে একত্রিত করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে, পূর্বে যে কাজ করতে ৯টি আলাদা রেডিও সিস্টেম প্রয়োজন হতো, এখন তা একমাত্র চিপ দিয়েই সম্পন্ন করা যাবে। এই চিপ মিলিমিটার-ওয়েভ এবং টেরাহার্টজ উভয় যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সমর্থন করার পাশাপাশি একটি বিশাল স্পেকট্রাম জুড়ে নিরবিচ্ছিন্ন স্যুইচিংয়ের সুবিধা দেবে।

পিকিং ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ওয়াং জিংজুন বলেন, সিক্স-জি উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এটি জরুরি প্রয়োজন। সংযুক্ত ডিভাইসগুলোর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, তাই পরবর্তী প্রজন্মের নেটওয়ার্কগুলোকে বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডের শক্তি কে কাজে লাগাতে হবে। তিনি আরও বলেন, মিলিমিটার-ওয়েভ এবং টেরাহার্টজের মতো উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডগুলো বিশাল ব্যান্ডউইথ এবং অত্যন্ত কম ল্যাটেন্সি সরবরাহ করে; যা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং জটিল অস্ত্রোপচারের মতো অ্যাপ্লিকেশনগুলোর জন্য উপযুক্ত। অন্যদিকে, মাইক্রোওয়েভের মতো নিম্ন-ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডগুলো বিস্তৃত অঞ্চলকে আচ্ছাদিত করতে এবং সংকেত প্রবেশযোগ্যতা বাড়াতে বিশেষভাবে কার্যকর, যা প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চল, গভীর সমুদ্র এবং মহাকাশের মতো চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে নেটওয়ার্ক সংযোগ নিশ্চিত করে।

পিকিং ইউনিভার্সিটির সহ-গবেষক শু হাওয়েন বলেন, একটি মাত্র চিপ এখন সেই কাজ করছে যা আগে একাধিক ডেডিকেটেড ডিভাইসের মাধ্যমে করা হতো। এটি সত্যিকার অর্থে বহুমুখী প্রোগ্রামিং এবং গতিশীল ফ্রিকোয়েন্সি সমন্বয় সম্ভব করেছে। আকার, বিদ্যুৎ খরচ এবং কর্মক্ষমতার মধ্যে এটি এক নজিরবিহীন ভারসাম্য তৈরি করেছে। এর ফলশ্রুতিতে কোনো কনসার্ট, ক্রীড়া ইভেন্ট বা জনাকীর্ণ অন্য যেকোনো স্থানে, যেখানে হাজার হাজার ডিভাইস একই সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, সেখানে সিগনাল হস্তক্ষেপের সমস্যা দূর হবে। ওয়াং জিংজুন জানান, এই প্রযুক্তি অত্যন্ত নমনীয় ও এআই-চালিত ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কের পথ খুলে দিতে পারে।