পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সৈকত ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিতই ভেসে আসছে ডলফিনের মরদেহ। সব শেষ গত সোমবার বিকেলে সমুদ্রসৈকতে আরও একটি মৃত ইরাবতী ডলফিন ভেসে এসেছে। এর আগে গত আগস্ট মাসে তিন দফায় আসে তিনটি ডলফিনের মরদেহ। তার আগে চলতি বছরের বিভন্ন সময়ে ভেসে এসেছে আরও চারটি মৃত ডলফিন। পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন (উপরা) নামের একটি সংগঠনের হিসাবমতে গত আট বছরের, সৈকত ও সংলগ্ন এলাকায় দেড় শতাধিক মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে। পরে সেগুলো মাটি চাপা দেওয়া হয় সৈকত এলাকায়ই। প্রতিটি ডলফিনের শরীরে ক্ষতচিহ্ন থাকলেও কোনো ধরনের তদন্ত বা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয় না কখনো। উদ্ধারের পরই তড়িঘড়ি করে মাটিচাপা দেওয়া হয়। ফলে ডলফিনগুলো ঠিক কী কারণে মারা গেছে সেটিও চাপা পড়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডলফিন সমুদ্রের স্বাস্থ্যের সূচক। এভাবে ডলফিন মরতে থাকলে সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান নিয়ে সংশয় তৈরি হয়।
স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, মাছ ধরার জালে আটকে শ্বাসরোধ অথবা দূষিত পানির সংস্পর্শে এসে অনেক ডলফিন মরছে। কখনো আবার জাহাজের ধাক্কায় প্রাণ হারাচ্ছে। কিন্তু সরকারি নথিপত্রে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হচ্ছে প্রাকৃতিক মৃত্যু।
তাদের অভিযোগ, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে না সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ। তদন্ত বা সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিয়ে ডলফিনগুলোকে তড়িঘড়ি মাটি চাপা দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছে।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হোসেন রাজু ২০১৭ সাল থেকে মৃত ডলফিন উদ্ধারে কাজ করছেন। তিনি বলেন, শুরুর দিকে লাশ পচে দুর্গন্ধ ছড়াত তখনই নিজ উদ্যোগে মাটি চাপা দিতে শুরু করি, পরে পরিবেশ, পর্যটনকর্মী ও ট্যুর গাইডদের সহযোগিতায় ডলফিন রক্ষা কমিটি গঠন করা হয়। তাদের নথি অনুযায়ী ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত সৈকতে ভেসে আসা মৃত ডলফিনের সংখ্যা ১৩১। এ ছাড়াও অসংখ্য কচ্ছপ ও তিমির মৃতদেহ সৈকতে ভেসে আসে ।
তিনি বলেন, কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে গত আট বছরে অন্তত দেড়শ ডলফিন ভেসে এসেছে মৃত অবস্থায়। একটি ডলফিনেরও ময়নাতদন্ত হয়নি। ফলে মৃত্যুরহস্য আজও অন্ধকারে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও মৎস্য গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ডলফিন সমুদ্রের স্বাস্থ্যের সূচক। এর উপস্থিতি মানে ইকোসিস্টেমে ভারসাম্য অটুট। সমুদ্রের নীল অর্থনীতি রক্ষায় জরুরি ডলফিনের নিরাপদ অভয়ারণ্য।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সম্প্রতি কুয়াকাটার পানিতে ১৭৯ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেছেন। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, গভীর সমুদ্রের তুলনায় উপকূলীয় ডলফিনের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি, যেটা ডলফিনের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
ওয়ার্ল্ডফিশের সহযোগী গবেষক বখতিয়ার উদ্দিন বলেন, ‘ডলফিন একটি নির্দেশক প্রজাতি। অর্থাৎ এর উপস্থিতি নদী ও সমুদ্রের পানির মান, খাদ্যপ্রাচুর্য এবং ভালো প্রতিবেশ ব্যবস্থার সুস্থতা নির্দেশ করে। একের পর এক ডলফিন মারা যাওয়া মানে পানিদূষণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা, অসাধু জেলে বিষ দিয়ে মাছ ধরে, নৌযানের চাপ ও বাসস্থান ধ্বংসের মতো বড় পরিবেশগত সমস্যার সংকেত।
তিনি বলন, এটি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। এদের রক্ষা করার জন্য স্থানীয় জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং ডলফিন অভয়ারণ্য এলাকায় জাল, বিশেষ করে অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি।
ডলফিন রক্ষা কমিটির টিম লিডার রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, ‘উপকূলে একের পর এক ডলফিনের মৃত্যু হলেও সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ডলফিন নিধনের হার আরও বাড়বে এবং উপকূলের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।’