চবি শিক্ষার্থী-গ্রামবাসী সংঘর্ষ

এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে চিহ্নিত হামলাকারীরা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ থানায় মামলা দায়ের করেছে। তবে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো সন্ত্রাসীকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ। হামলার ৭২ ঘণ্টা পর মাত্র ৮ জন গ্রেপ্তার হলেও চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা এখনো অধরা।

এদিকে সশস্ত্র হামলায় আহত শিক্ষার্থীদের অনেকে কর্মক্ষমতা হারাতে পারেন। গুরুতর আহত তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে আইসিইউতে থাকা ইমতিয়াজ সায়েমের অবস্থা উদ্বেগজনক। ৫৫ ঘণ্টা পেরোলেও তার জ্ঞান ফেরেনি।

ঘটনার শুরু থেকে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে। গত শনিবার রাতে সংঘর্ষের কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কিন্তু অজানা কারণে নিরাপত্তা বাহিনীকে ক্যাম্পাস থেকে ফেরত পাঠানো হয়। গত রবিবার সকাল ১১টায় সংঘর্ষ পুনরায় শুরু হলেও সেনাবাহিনী সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। এর মধ্যে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হামলায় ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। স্থানীয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে ছদ্মবেশে নিষিদ্ধ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা হামলা চালায়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, দেশীয় অস্ত্র, ছুরি, চাপাতি, রামদা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গত রবিবার দুপুরে জোবরা গ্রামে কয়েক শিক্ষার্থীকে ধানক্ষেতে নিয়ে রামদা দিয়ে কোপানো হয়। এতে জড়িত ছিলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল মাহমুদ ত্রিশাদ, ১১ নম্বর পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের আহ্বায়ক, রাউজানের এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর অনুসারী। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতা জহির উদ্দিন চৌধুরী টিটুও হামলার নির্দেশ দেন বলে জানা যায়। তিনি ফেসবুকে প্রচারণাও চালান। স্থানীয়রা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে হামলার জন্য লোক জড়ো করেন। ২ নম্বর গেটের কাছে বাচামিয়ার দোকানের সামনে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ঘিরে হামলা চালানো হয়।

ছাত্রদের ওপর হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা দপ্তরের প্রধান আব্দুর রহিম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। অস্ত্রাগার লুটের ঘটনায় প্রক্টর অফিস সাধারণ ডায়েরি করেছে। আর হাটহাজারী থানায় ৯৮ জনের নামে মামলা হয়, ১ হাজার জন অজ্ঞাত আসামি। মামলার প্রধান আসামি নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ হানিফ। বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন কর্মচারীও আসামি। তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা উদয় কুসুম বড়ুয়াকে আসামি করা হয়নি। এ নিয়ে শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

আহতদের তিন জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক : আহতদের মধ্যে তিন শিক্ষার্থী জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। ইসলামিক স্টাডিজের নাইমুল ইসলাম রাফি ন্যাশনাল হাসপাতালের আইসিইউতে। তার শরীরে গভীর ক্ষত। তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। সমাজতত্ত্বের মো. মামুনের মস্তিষ্কে রক্তজমাট ও খুলির টুকরো প্রবেশের জটিলতায় অস্ত্রোপচার হয়েছে। খুলি সারার আগে বসানো যাবে না। ইমতিয়াজ সায়েম পার্কভিউ হাসপাতালের আইসিইউতে, ৭২ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে আছে। তার মায়ের কান্নায় হাসপাতাল ভারী।

নিরাপত্তাহীনতায় শিক্ষার্থীরা : সংঘর্ষের পর শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা। রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে নিরাপদ ক্যাম্পাসের প্রত্যাশা। মঙ্গলবার ৫৬৩তম জরুরি সিন্ডিকেট সভায় ১৩টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে মডেল থানা, নিরাপত্তা চৌকি, ১০টি হল নির্মাণ, শাটল ট্রেনে নিরাপত্তা জোরদার, মেডিকেল সেন্টারকে ৫০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তর, ২টি অ্যাম্বুলেন্স কেনা।

সেখানে হামলার নিন্দা জানিয়ে আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।

সিন্ডিকেট সভায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের সুপারিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েন, টহল জোরদার, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে মতবিনিময় ও স্থানীয়দের ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত হয়।

 উল্লেখ্য, ২ নম্বর গেট এলাকায় ভাড়া বাসায় দেরিতে প্রবেশের জন্য দারোয়ান এক ছাত্রীকে চড় মারেন বলে অভিযোগ। এ নিয়ে শনিবার দুপুর ১২টা থেকে ৪টা ও রবিবার ১১টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সংঘর্ষ হয়। চবি মেডিকেল প্রধান ডা. আবু তৈয়ব ৪২১ জন শিক্ষার্থী আহতের তথ্য নিশ্চিত করেন।