ভোটে বাধার শঙ্কা, সতর্ক সবাই

আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এতদিন শান্তিপূর্ণভাবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের কথা বলা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি বারবার বলে আসছে নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচন নিয়ে বাধার আশঙ্কা প্রকাশ করে রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক করেছেন। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এমন বক্তব্য এলে তা হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, প্রধান উপদেষ্টার কাছে হয়তো এমন কোনো তথ্য রয়েছে, যা এখনই প্রকাশ করতে চান না।

তাদের ভাষ্য, নির্বাচন সামনে রেখে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধ নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন প্রধান উপদেষ্টা।

এদিকে, একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টার এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া উচিত। নির্বাচনে বাধার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লাঠিপেটায় গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর আহত হওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তিনি দেখেছেন, নির্বাচন নিয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জুলাই সনদ, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে। এসব বিষয়ের সমাধান না হলে কেউ কেউ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে পারে। এসব বিষয় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এজন্য বাধার কথা বলার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক থাকতে বলেছেন।’

নির্বাচনে বাধার আশঙ্কা নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে আমরা কোনো বাধার আশঙ্কা করছি না। রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনীতির মাঠে বিভিন্ন বক্তব্য দিতে পারে। তাই বলে নির্বাচনে তা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না বলে মনে করি। দেশের স্বার্থে সবাই ঐকমত্যে আসবে বলে আশা করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, পিআর পদ্ধতি নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আরও আলোচনা হতে পারে। সেখানে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হতে পারে।’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংস্কার না করে নির্বাচনের সময় ঘোষণা, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি না দেওয়া, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন না করা বাধা বলে আমরা মনে করি। তা ছাড়া, নির্বাচনে সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি না করা, কালো টাকার প্রভাব রোধে পদক্ষেপ না নেওয়াও বাধা বলে মনে করি।’

নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে এখনো দূরত্ব রয়েছে। গত রবিবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন যমুনায় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বৈঠক শেষে গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরের ওপর হামলা অত্যন্ত গর্হিত কাজ এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা মনে করি, এটাকে গভীরভাবে তদন্ত করা দরকার। আমাদের আশঙ্কা, নির্বাচন বিলম্বিত করার লক্ষ্যে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে প্রধান উপদেষ্টা বিএনপিকে আশ্বস্ত করেছেন এবং নির্ধারিত শিডিউলেই নির্বাচন হবে বলে জানিয়েছেন।’

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করা ৩১টি দলের মধ্যে ২৫টি দল পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন চায়। কেউ শুধু উচ্চকক্ষে চায়, জামায়াতসহ অনেকে উভয় কক্ষে পিআর চায়। কেন্দ্র দখল ঠেকাতে এই নতুন পদ্ধতিতে নির্বাচন জরুরি। মেজরিটিকে অবজ্ঞা করে কারও চাপে নির্বাচনে গেলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আমাদের জন্য নির্বাচনে যাওয়া সংকুচিত হয়ে যাবে।’

‘দু-একটি দল জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে’এমন অভিযোগ করে তাহের বলেন, প্রধান উপদেষ্টার কাছে আইনি ভিত্তির দাবি জানিয়েছে জামায়াত। জুলাই সনদের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। বাস্তবায়ন না হলে জুলাই শহীদদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।’

এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে জুলাই সনদের চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আমরা বলেছি, জুলাই সনদের আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তির জন্য আগামী নির্বাচন যেন গণপরিষদ নির্বাচন হয়।’

নির্বাচনে বাধা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, প্রধান উপদেষ্টা আওয়ামী লীগ ও ভারতকে উদ্দেশ্য করে এ কথা বলেছেন। নির্বাচন যাতে বানচাল না হয়, সেজন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক করেছেন।’

গত রবিবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে এবং করবে। তাদের প্রতিহত করতে জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের বিষয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা কোথায় শঙ্কা দেখছেন, সেটি সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দিলে ভালো হতো। তবে আমার ধারণা, তিনি পরাজিত ফ্যাসিবাদী অপশক্তির নানা অপতৎপরতার কথা বলতে চেয়েছেন। পাশাপাশি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচন সামনে রেখে নানা বাহানা বা অজুহাতে নির্বাচন অনিশ্চিত করতে চাইছে, তাদের বোঝাতে চেয়েছেন বলে মনে করি।’

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘একেক দলের একেক দাবিতে গণভোট করতে গেলে এ দেশে আর নির্বাচন হবে না।’ তিনি বলেন, ‘যারা নির্বাচনে না আসার কথা বলে, তারা হাসিনার সুরেই কথা বলছে। দাবি না মানলে নির্বাচনে যাব না এমন বক্তব্য অগণতান্ত্রিক।’

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টি ও গণ অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে দিয়ে গণ অধিকার পরিষদের একটি মিছিল যাওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিপেটায় গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এ ঘটনার পর প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের শেষ দিন গত মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাতটি রাজনৈতিক দল ও একটি সংগঠনের প্রতিনিধিরা বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেন, ‘আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্য সরকারের। এ বিষয়ে বাধা আসবে বলে বৈঠকে সতর্ক করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘যারা অন্তর্বর্তী সরকারকে নির্বাচন পর্যন্ত পৌঁছাতে দিতে চায় না, তারা যত রকমভাবে পারবে বাধা দেবে। বাংলাদেশের সত্তাকে গড়ে তুলতে তারা বাধা দেবে। তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে নির্বাচন বানচাল করার। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে, যাতে নির্বাচন না হয়।’

এগুলোর কিছু কিছু লক্ষণ এখন দেখা যাচ্ছে জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন, ‘সামনে আরও আসবে। এজন্য আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে।’

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে হবে। নির্বাচিত সরকারের হাতে আমরা ক্ষমতা হস্তান্তর করব। এই নির্বাচন নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর, সাহস অর্জনের নির্বাচন হবে। নিজের ভূমিতে দেশ পরিচালনার নির্বাচন। এই নির্বাচনে অন্য কোনো দেশের থাবা মারার সুযোগ যেন না থাকে।’

এই নির্বাচন আয়োজনে প্রতি পদে বাধা আসবে উল্লেখ করে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সতর্ক করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘সবার মনে দ্বন্দ্ব তৈরি করার চেষ্টা করবে। আমরা যেন সঠিক থাকি, স্থির থাকি। সবাই একসঙ্গে সহযোগিতা করি।’

এবারের নির্বাচন অনন্য হবে বলে আশাবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন নয়। এটি এ দেশের সব মানুষের, সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচন। আমরা এই নির্বাচন আয়োজনে আপনাদের সর্বাত্মক সমর্থন চাই।’

প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে যাদের জয়লাভের সম্ভাবনা রয়েছে, তারা নির্বাচন চাইছে। অন্যদিকে, নির্বাচনে যাদের আশানুরূপ ফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তারা নানা অজুহাতে নির্বাচন পেছাতে চাইছে কিংবা নির্বাচনী পরিবেশ ঘোলাটে করতে চাইছে। এসব বিষয় হয়তো প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্পষ্ট হয়েছে, তাই তিনি বাধার আশঙ্কা করছেন।’