ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা, যার কেন্দ্রে রয়েছে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা ও মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ। এই ভ্রাতৃত্ববোধ কেবল নামেমাত্র কোনো সম্পর্ক নয়, বরং এটি এক শক্তি, যা মুসলিম উম্মাহকে একত্র করে একটি অটুট বন্ধনে আবদ্ধ করে। মুসলিম ঐক্য তাই কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়, বরং বাস্তব জীবনে শক্তি, সাহস ও মর্যাদার উৎস। ইতিহাস সাক্ষী, যখন মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, তখন তারা জগৎকে ন্যায়, সত্য ও মানবিকতার আলোকধারায় আলোকিত করেছিলেন। আবার বিভক্ত হলে তারা দুর্বল হয়ে পড়েছেন, শত্রুর হাতে পরাজিত হয়েছেন এবং বিশ্বমঞ্চে তাদের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে গেছে।
আজকের পৃথিবীতে মুসলিম উম্মাহ নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, ইয়েমেন কিংবা মিয়ানমার, প্রতিটি জায়গায় মুসলিমরা নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার। অথচ এককভাবে বা বিভক্ত অবস্থায় এসব অন্যায় প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সম্মিলিত শক্তি, যেখানে মুসলিম উম্মাহ তাদের পারস্পরিক মতবিরোধ ভুলে গিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করবে। কারণ আল্লাহতায়ালা কোরআনে মুমিনদের একে অপরের সহায়ক ঘোষণা করেছেন। তারা সৎকাজের নির্দেশ দেন, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখেন, নামাজ কায়েম করেন, জাকাত আদায় করেন এবং আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করেন। এ এক আধ্যাত্মিক কাজ, যা মুসলিমদের ঐক্যের ভিত্তি।
ঐক্যের এই শিক্ষা প্রথম বাস্তবায়িত হয়েছিল মদিনায়, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুহাজির ও আনসারদের ভ্রাতৃত্বসূত্রে আবদ্ধ করেছিলেন। সেই ভ্রাতৃত্ব শুধু একটি সামাজিক সম্পর্ক ছিল না, বরং তা মুসলিম উম্মাহকে রূপ দিয়েছিল এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে। বদর, ওহুদ ও খন্দকের মতো যুদ্ধে এ ঐক্যের শক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আজও মুসলিম বিশ্বের জন্য এই ঐতিহাসিক শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু বাস্তবতায় মুসলিমরা আজ নানা কারণে বিভক্ত। রাজনৈতিক স্বার্থ, ভৌগোলিক সীমারেখা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য প্রভৃতি বিষয় আমাদের ঐক্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শত্রুরা এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে মুসলিম উম্মাহকে সহজ শিকার বানাচ্ছে। তবুও আশার কথা, ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, বৈচিত্র্যই হতে পারে শক্তির উৎস, যদি তা ঐক্যের জন্য ব্যবহৃত হয়। আমাদের সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে নিবেদিত থাকা।
অতএব বর্তমান সময় আমাদের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে ফিলিস্তিনে আমাদের ভাই-বোনদের রক্ত ঝরছে, ঘরবাড়ি ধ্বংস হচ্ছে, শিশু ও নারীরা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মুসলিম উম্মাহ যদি ঐক্যবদ্ধ না হয়, তবে আমাদের দুর্দশা আরও বাড়বে।