৫ লাখ মানুষের জীবন কেড়েছে জ্বালানি কোম্পানিগুলো!

বিশ্বের শীর্ষ জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো চলতি শতাব্দীতে শতাধিক তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়িয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচার-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে। এসব তাপপ্রবাহে বিশ্ব জুড়ে ৫ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অর্ধেকেরও বেশি দায়ী ১৮০টি জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানি। এর মধ্যে মাত্র ১৪টি কোম্পানি একাই বাকি সবার সমান নির্গমন ঘটিয়েছে। তাদের দূষণের কারণে ৫০টিরও বেশি তাপপ্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে।

গত বুধবার প্রকাশিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৬৩টি দেশে সংঘটিত ২১৩টি তাপপ্রবাহ বিশ্লেষণ করেছেন। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এসব তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হয়েছে। এই তাপপ্রবাহগুলোর জটিলতা বৃদ্ধিতে ১৮০টি বৃহৎ জীবাশ্ম জ্বালানি ও সিমেন্ট কোম্পানির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে, যাদের বৈশ্বিকভাবে ‘কার্বন মেজর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রথমবারের মতো এই গবেষণা নির্দিষ্ট কোম্পানিগুলোকে প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের সঙ্গে সরাসরি যু ক্ত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক নর্থওয়েস্ট হিট ডোম এবং ২০২৩ সালের ইউরোপীয় তাপপ্রবাহের সঙ্গে এই কোম্পানিগুলোর দায় জড়িত। দায়ী কোম্পানির তালিকায় রয়েছে সৌদি আরামকো, রাশিয়ার গ্যাজপ্রম, মার্কিন এক্সনমোবিল, শেভরন, এবং ব্রিটিশ কোম্পানি বিপি ও শেল। জাতিসংঘের আন্তঃসরকারি জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (আইপিসিসি) একাধিকবার সতর্ক করে বলেছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন, প্রধানত গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের কারণে, ১৯৫০-এর দশক থেকে বিশ্বব্যাপী তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়িয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি তাপপ্রবাহ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও ঘন ঘন এবং প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, চরম তাপ মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে, কারণ এটি শরীরের শীতলীকরণ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে এবং হিটস্ট্রোকসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ তীব্র গরমের কারণে প্রাণ হারাচ্ছে। গবেষণার অন্যতম লেখক রিচার্ড হিডে বলেন, ‘এই প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে নির্দিষ্ট তাপপ্রবাহের সঙ্গে নির্দিষ্ট কোম্পানির দায় সংযুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্প শুধু সামগ্রিকভাবে নয়, পৃথক কোম্পানিগুলোও আইনি ও সামাজিকভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে পারে।’

এটিই প্রথম নয় যে জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৩৬টি কোম্পানি বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমনের জন্য দায়ী।

কার্বন ডাইঅক্সাইড হলো প্রধান মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউজ গ্যাস, যা জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, শিল্প প্রক্রিয়া এবং সিমেন্ট উৎপাদন থেকে উৎপন্ন হয়। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে এর ঘনত্ব ৫০ শতাংশ বেড়েছে, যা পৃথিবীর মোট উষ্ণায়ন-সৃষ্টিকারী নির্গমনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী। গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্ব জুড়ে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা বাড়ছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ক্ষয়ক্ষতির দায়, মিথ্যা পরিবেশবান্ধব প্রচারণা, এবং জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি।

গ্রানথাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র পলিসি ফেলো ক্যাথরিন হাইহ্যাম বলেন, ‘সরকার ও কোম্পানিগুলো ক্রমশ বুঝতে পারছে যে তেল ও গ্যাস প্রকল্প চালিয়ে গেলে তাদের আদালতে জবাবদিহি করতে হবে।’

গত জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত জলবায়ু পরিবর্তনের দায় নিয়ে এক ঐতিহাসিক মতামত দিয়েছে। এতে বলা হয়, জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকে আন্তর্জাতিকভাবে বেআইনি কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে এবং ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী। গবেষকরা জানিয়েছেন, ন্যাচার-এর এই গবেষণা আদালতের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত প্রমাণ। তারা বলেন, ‘এখন আমরা স্পষ্টভাবে বলতে পারি কে দায়ী। ক্ষতির হিসাব মেটানোর সময় এসেছে, এবং এই দূষণকারীদের তাদের কর্মকাণ্ডের মূল্য চুকাতে হবে।’