আন্দোলন-বিক্ষোভ, সহিংসতা-প্রাণহানি গত এক সপ্তাহেরও কম সময়ে নেপালে অভূতপূর্ব অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। সব শেষ গতকাল শুক্রবার দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে নতুন এক অধ্যায়। প্রথমবারের মতো কোনো নারী প্রধানমন্ত্রী পেল নেপাল। গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত সোয়া ৯টায় নেপালের রাষ্ট্রপতি ভবনে শপথ নেন সুশীল কার্কি। তাকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেল।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স, নেপালের সংবাদমাধ্যম নেপালি টাইমস ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানায়, কার্কির শপথ গ্রহণের পরই নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের ৫ মার্চে হবে নির্বাচন।
নেপালের রাজনীতিতে আকস্মিক উথাল-পাতালের পেছনে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করার প্রতিবাদে গত সপ্তাহের ভয়াবহ বিক্ষোভ। তরুণ-যুবাদের (জেন-জি) ওই আন্দোলন সরকারবিরোধী সহিংসতায় রূপ নেয়।
সব মিলিয়ে প্রায় অর্ধশত মানুষের প্রাণহানি, হাজারের বেশি আহতের ঘটনায় অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে দেশটি। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগ করে পালাতে বাধ্য হন। তারপর সেনা মোতায়েন করা হয় রাজধানী কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন শহরে। সেনাপ্রধান অশোক রাজ সিগদেলের মধ্যস্থতায় চলতে থাকে আন্দোলনকারী বিভিন্ন গ্রুপ ও প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেলের মধ্যে আলোচনা। গত বৃহস্পতিবারের এক বৈঠকে সব পক্ষের মতৈক্য হওয়ার পরই কার্কিকে প্রধানমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পরে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় জানায়, কার্কিই হচ্ছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনা শুধু দেশটির নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক দৃশ্যপটে একটি মাইলফলক। জেন-জি প্রজন্মের ডিজিটাল শক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে ওঠা এ আন্দোলন ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নেপাল ভারত ও চীনের মধ্যবর্তী সংবেদনশীল অঞ্চলে অবস্থিত।
রয়টার্স বলছে, কার্কির নিয়োগ ‘জেন-জি গ্রুপগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ তার দুর্নীতিবিরোধী অটলতা তাদের কাছে আদর্শ। আলজাজিরার সাংবাদিক রব ম্যাকব্রাইডের ভাষ্য, ‘কার্কিকে দেখা হয় একজন দুর্নীতিবিরোধী কণ্ঠস্বর হিসেবে, যা জেন-জি আন্দোলনের মূল চাহিদা পূরণ করে।’
সুশীলা কার্কি, ১৯৫২ সালের ৭ জুন বিরাটনগরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতামাতা শঙ্করপুরের বাসিন্দা। সাত ভাইবোনের সবার বড় তিনি। ১৯৭২ সালে মহেন্দ্র মোরাং কলেজ থেকে স্নাতক, ১৯৭৫ সালে ভারতের বারানসি হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনৈতিক বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৭৮ সালে ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৯ সালে অ্যাডভোকেট হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন এবং ১৯৮৫ সালে ধরানের মহেন্দ্র মাল্টিপল ক্যাম্পাসে শিক্ষকতা করেন।
কার্কি বিচার বিভাগের মানুষ হলেও জীবন রাজনৈতিক সংগ্রামে ভরা। ১৯৯০ সালের পিপলস মুভমেন্টে অংশ নিয়ে পঞ্চায়েত রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং বিরাটনগর জেলে কারারুদ্ধ হন। সে অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০১৯ সালে উপন্যাস ‘কারা’ লেখেন, যা নারীদের নিপীড়নের কথা বলে। ২০০৮ সালে নেপাল বার অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র অ্যাডভোকেট হন। ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাড-হক জজ। ২০১০ সালে স্থায়ী জজ এবং ২০১৬ সালের ১১ জুলাই নেপালের প্রথম নারী প্রধান বিচারপতি হন। ২০১৭ সালের ৬ জুন অবসরে যান তিনি।
দায়িত্ব পালনকালে দুর্নীতিবিরোধী তকমা পান তিনি। ২০১৬ সালে অ্যান্টি-গ্রাফট কমিশনের প্রধান লোকমন সিং কার্কিকে (কোনো সম্পর্ক নেই) অযোগ্য বলে বরখাস্ত করেন। ২০১২ সালে তথ্যমন্ত্রী জয়প্রকাশ গুপ্তকে দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। ২০১৬ সালে মাওবাদী নেতা বলকৃষ্ণ ধুনগেলকে ক্ষমা না দেওয়ার রায় দেন। ২০১৭ সালে মাওবাদী প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহালের পুলিশ প্রধান নিয়োগকে উল্টে দেন, যা সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে। এর ফলে দাহালের কোয়ালিশন (নেপাল কংগ্রেসের শের বাহাদুর দেওয়াসহ) তাকে ইমপিচমেন্ট করার চেষ্টা করে, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট থামিয়ে দেয়।
ছোট থেকেই কার্কির জীবনে রাজনৈতিক সংযোগ রয়েছে। বিরাটনগরে বিপি কোইরালার পরিবারের সান্নিধ্যে বড় হন এবং স্বামী দুর্গা প্রসাদ সুবেদী ১৯৭৩ সালে রয়্যাল নেপাল এয়ারলাইনসের বিমান হাইজ্যাক করে নেপাল কংগ্রেসের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। তার আত্মজীবনী ‘ন্যায়া’ (২০১৮) এবং সাধারণ জীবনযাত্রা তাকে জনপ্রিয় করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে সন্দেহ উঠলেও, জেন-জি তাকে পছন্দ করেছে।
কার্কিকে এখন একটি কাউন্সিল অব মিনিস্টার গঠন করতে হবে, যাতে জেন-জি প্রতিনিধি, টেকনোক্র্যাট এবং রাজনীতিবিদ থাকবে। তিনি বলেছেন, ক্যাবিনেট সদস্যরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
টাইমস অব ইন্ডিয়া রিপোর্ট করেছে, এ সরকারের প্রথম কাজ শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং সহিংসতার তদন্ত করা। পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রুপকে একত্রিত করা, সেনাবাহিনীর সমর্থন নেওয়া কিন্তু তাদের অতিরিক্ত ক্ষমতা না দেওয়া এবং ভারত-চীনের ভূরাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করা। এ ছাড়া অর্থনৈতিক স্থবিরতা, যুব বেকারত্ব এবং দুর্নীতি মোকাবিলায় সংস্কার দরকার। বিচার, নির্বাহী ও আইনসভা পুনর্নির্মাণ করতে হবে এবং স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে।