বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কাভার্ড ভ্যানের পেছনে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাইভেট কার ঢুকে বাবা-মেয়ে নিহত হয়েছে। গতকাল দুপুরে ফেনীতে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সিরাজগঞ্জে মিশুক-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে এক এসআই নিহত হন। বৃহস্পতিবার রাতে কাভার্ড ভ্যানে পিষ্ট হয়ে একজন নিহত হন। বিস্তারিত আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে :
দাঁড়িয়ে থাকা কাভার্ড ভ্যানের পেছনে ঢুকে গেল প্রাইভেট কার : চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কাভার্ড ভ্যানের পেছনে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাইভেট কারের ধাক্কায় শিশুসহ দুজন নিহত হয়েছে। এ সময় আহত হয়েছেন আরও চারজন। গতকাল শুক্রবার সকালে উপজেলার ঠাকুরদীঘি এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী অংশে এ দুর্ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয়রা এসে আহত এবং নিহতদের উদ্ধার করে।
নিহতরা হলেন গোলাম সরওয়ার (৪২) ও তার তিন বছরের কন্যাশিশু মুসকান।আহতরা হলেন নিহত গোলাম সরওয়ারের স্ত্রী উম্মে সালমা (৩২), ছেলে আহমেদ ইমতিয়াজ (৯), গোলাম সারোয়ারের বন্ধু সাগর (৩০) ও গাড়িচালক গিয়াস উদ্দিন (৩০)। সাগর ও গিয়াস উদ্দিনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। নিহত এবং আহতরা সবাই রাজধানীর উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টর এলাকার বাসিন্দা।
জানা গেছে, শুক্রবার ভোরে নিহত গোলাম সরওয়ার পরিবার নিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন পর্যটন এলাকা ঘুরতে বেড়িয়েছিলেন। তাদের চট্টগ্রামের ফয়’স লেকে বেড়িয়ে কক্সবাজার যাওয়ার কথা ছিল। পথিমধ্যে চট্টগ্রামের ঠাকুরদীঘি এলাকায় পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাভার্ড ভ্যানের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয় তাদের বহনকারী কারটি।
জোরারগঞ্জ হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামমুখী প্রাইভেট কার (ঢাকা মেট্রো ঘ-১৩-৭৩৪৮) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঠাকুরদীঘি এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা কাভার্ড ভ্যানের (ঢাকা মেট্রো উ-১১-৭১৬৮) পেছনে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলে শিশুসহ দুজন নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িগুলো উদ্ধার করে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’
ফেনীতে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন নিহত : ফেনীতে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদ গেট ও সদরের পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার বীজবাগ গ্রামের আহমেদ শরীফ (৩৮) ও ফেনী পৌর এলাকার পশ্চিম রামপুরের মো. ইব্রাহিম (৩৪)।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদ গেট এলাকায় চট্টগ্রামমুখী লেনে বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল চালক আহমেদ শরীফ (৩৮) গুরুতর আহত হন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে ফাজিলপুর হাইওয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাত ২টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সামনে সড়কের পাশের ঝোপে একটি সিএনজি অটোরিকশা উল্টে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। নিহত সিএনজি অটোরিকশাচালক ইব্রাহিম লালপুল এলাকা থেকে সিএনজিতে গ্যাস নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় তার সিএনজি অটোরিকশাটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
এ ব্যাপারে মহিপাল হাইওয়ে থানার ওসি হারুন অর রশিদ বলেন, নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ফেনী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সিরাজগঞ্জে মিশুক-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে এসআই নিহত : সিরাজগঞ্জ শহরে ব্যাটারিচালিত মিশুক-মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে পুলিশের এক উপপরিদর্শক (এসআই) নিহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে শহরের নিউ মার্কেট ও পুলিশ লাইন আঞ্চলিক সড়কের বাস টার্মিনাল মসজিদের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এসআই পরিমল চন্দ্র ঘোষ (৫৭) সিরাজগঞ্জ পুলিশ লাইনে কর্মরত ছিলেন। তিনি পাবনার বেড়া উপজেলার মালদাপাড়ার পরেশ চন্দ্র ঘোষের ছেলে।
সিরাজগঞ্জ সদর থানার ওসি মোখলেছুর রহমান জানান, এসআই পরিমল পুলিশ লাইন থেকে মোটরসাইকেলযোগে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন। ঘটনাস্থলে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা ব্যাটারিচালিত মিশুকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে এসআই পরিমল মাথায় গুরুতর আঘাত পান। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে ও পরে শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি আরও জানান, ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যায় নিহতের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ব্যাটারিচালিত মিশুকচালক পালিয়ে গেছেন।
মেলা দেখে বাড়ি ফেরা হলো না মাসুদ রানার : চিরিরবন্দর থেকে পার্বতীপুর খোলাহাটি ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ও বাণিজ্য মেলা দেখতে এসেছিলেন মাসুদ রানা। মেলা দেখা শেষে বাড়ি ফেরার পথে পার্বতীপুর-রংপুর আঞ্চলিক সড়কের হুগলিপাড়া নামক এলাকায় একটি কাভার্ড ভ্যানের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান মাসুদ। এ ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী আরও দুজন আহত হয়েছেন। পার্বতীপুর মডেল থানা পুলিশ কাভার্ড ভ্যানটি আটক করেছে। কাভার্ড ভ্যানচালক পলাতক রয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে পার্বতীপুর-রংপুর আঞ্চলিক সড়কের হুগলিপাড়া নামক স্থানে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মাসুদ রানা দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার পুনট্টি ইউনিয়নের দক্ষিণ ভবানীপুর গ্রামের ফেরদৌস হোসেনের ছেলে।
আহত মোহাম্মদ মাসুম পার্বতীপুর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের আমবাড়ী কুতুবপুর গ্রামের মেজবাউল হকের ছেলে এবং মোস্তাইন ইসলাম রিফাত উপজেলার হাবড়া ইউনিয়নের ফুলেরঘাট শংকরপুর গ্রামের শফিকুল ইসলামের ছেলে।
পার্বতীপুর মডেল থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, পাশর্^বর্তী উপজেলা চিরিরবন্দর থেকে পার্বতীপুর খোলাহাটি ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ও বাণিজ্য মেলা দেখতে আসেন। মেলা ঘোরাঘুরি শেষে বাড়ি ফেরার পথে এ মর্মান্তিক দুঘটনা ঘটে। নিহত মাসুদ রানার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় সড়ক পরিবহন আইনে একটি মামলা হয়েছে। কাভার্ড ভ্যানটি থানায় আটক করা হয়েছে। চালক পালিয়ে গেছেন।
ফুটবল কুড়াতে গিয়ে প্রাণ গেল ছোট্ট রাফির : ময়মনসিংহের ত্রিশালে মহাসড়কে গড়িয়ে যাওয়া ফুটবল কুড়াতে গিয়ে অটোভ্যানের ধাক্কায় আল রাফি খান (৭) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহত রাফি পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ডের খান বাড়ির আজগর আলী খানের একমাত্র ছেলে। সে স্থানীয় নজরুল সেনা স্কুলের প্লে শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ত্রিশাল ফিলিং স্টেশন এলাকায় বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলছিল রাফি। খেলার একপর্যায়ে বল মহাসড়কে গড়িয়ে গেলে সেটি আনতে যায় সে। এ সময় দ্রুতগামী একটি অটোভ্যান ধাক্কা দিলে গুরুতর আহত হয় রাফি। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন বাবা-মা। বাবা আজগর আলী খান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলেকে খেলতে খেলতে হারাতে হবে, এটা ভাবতেও পারিনি। ও ছিল আমাদের দুই সন্তানের মধ্যে বড়। এখন আমরা নিঃস্ব হয়ে গেলাম।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এলাকাজুড়ে খেলার মাঠ না থাকায় শিশু-কিশোররা প্রতিদিন মহাসড়কের পাশে খেলতে বাধ্য হয়। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। তারা শিশুদের জন্য খেলার মাঠ তৈরি ও মহাসড়কের পাশে সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলার দাবি জানান।
নজরুল সেনা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম বলেন, “রাফি ছিল ভদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থী। এত অল্প বয়সে তাকে হারানো অত্যন্ত বেদনার।”
ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনসুর আহাম্মদ বলেন, “খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। নিহতের পরিবার মামলা না করে বিনা ময়নাতদন্তেমরদেহ নিতে চাইলে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।