কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা ছোট্ট গ্রাম ভাবেরমুড়া। একসময় অজপাড়াগাঁ হলেও আজ এই গ্রামের নাম ছড়িয়ে পড়েছে দুর-দুরান্তে। এর কারণ এখানে রয়েছে এমন এক নলকূপ যা না চাপলেই চলে। বরং একটানা ২৪ ঘণ্টা ঝরছে পানি, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর।
সাদা চোখে দেখলে সাধারণ একটি নলকূপ। তবে কাছে গেলে বোঝা যায় এটি যেন কিছুটা ব্যতিক্রম। হাতল পড়ে আছে নীচে, কেউ ছোঁয় না, ছোঁয়ার দরকারও হয় না। তবু নিচ থেকে টলমল করে উঠে আসে স্বচ্ছ পানি। চারপাশে শোরগোল পড়ে, ‘এ কেমনে সম্ভব?’
প্রায় দুই যুগ আগের কথা। ভাবেরমুড়ায় তখন ভয়াবহ পানির সংকট। গ্রামের প্রাণকেন্দ্র পাক দরবার শরিফের পাশে একটি নলকূপ বসানো হয় পানির কষ্ট মেটাতে। সেদিনই প্রথম অবাক হন এলাকাবাসী। খননের পরদিন থেকেই পানি ঝরা শুরু। আশ্চর্যের বিষয় হলো আজ পর্যন্ত সেই ধারা আর থামেনি।
গ্রামের প্রবীণরা বলেন, এমন ঘটনা তারা আগে কখনো দেখেননি। কেউ বলছেন অলৌকিক, কেউ বলছেন রহমত। তবে একটা ব্যাপারে সবাই একমত, এ নলকূপ যেন এই গ্রামকে আশীর্বাদ দিয়ে গেছে।
এ বিষয়ে ৬০ বছর বয়সী শফিকুর রহমান বলেন, জীবনে অনেক নলকূপ দেখেছি, এমনটা দেখিনি। কোনো চাপ ছাড়াই পানি ঝরছে বছরের পর বছর। আল্লাহর রহমত ছাড়া এটা আর কী হতে পার!
শুধু ভাবেরমুড়াই নয়, আশপাশের পাঁচ-ছয়টি গ্রামের মানুষও প্রতিদিন এই নলকূপের পানি নিতে আসে। কারও প্রয়োজন খাবার পানির, কারও ওজুর। কেউ আবার এ পানিকে মনে করেন রোগ সারানোর ওষুধ। এমনকি ভারতীয় সীমান্ত পেরিয়ে ত্রিপুরা থেকেও লোকজন আসে শুধু এই পানি সংগ্রহ করতে।
নলকূপের পানি শুধু পান করেই থেমে নেই। পাশের খাল ধরে তা পৌঁছে যায় কৃষিজমিতে। ফলে খরায় যখন চারদিক ফেটে চৌচির, ভাবেরমুড়ায় তখনও সবুজের ছোঁয়া।
এ বিষয়ে স্থানীয় কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, জানেন, খরা মৌসুমেও আমরা চিন্তামুক্ত থাকি। পাশের গ্রামের চাষ বন্ধ হলেও আমরা এই পানি দিয়েই জমি সেচ দিই। ফলনও ভালো হয়।
এই নলকূপকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ধর্মীয় এক বিশ্বাসও। প্রতিদিন শত শত ভক্ত মাজারে আসেন। কেউ দোয়া করেন, কেউ শুধুই এই ‘অলৌকিক’ পানি একবার চোখে দেখার জন্য ছুটে আসেন।
দরবার শরিফের খাদেম মাও. কাজী দিদারুল হক বলেন, অনেকে বলে এ পানি দিয়ে রোগ ভালো হয়েছে। কেউ বিশ্বাস করেন, এটা অলৌকিক পানি। আমরা এটাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ রহমত হিসেবে দেখি।
ভারতের ত্রিপুরা নজরপুর এলাকার থেকে আসা শরীফ নামে এক যুবক বলেন, এটি সত্যিই অলৌকিক ঘটনা। হাতল ছাড়া নলকূপ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে। আমরা প্রতিনিয়ত এখান থেকে পানি নিয়ে যাই। সাধারণত শীতকালে খাল-বিলের পানি, পুকুরে পানি অনেক ঠান্ডা থাকে কিন্তু এই নলকূপের পানি গরম থাকে। মানুষজন পুকুরে গোসল না করে এই নলকূপের গরম পানি দিয়ে গোসল করে।
স্থানীয় মাহফুজ বলেন, এই নলকূপ থেকে দিনরাত ঝরছে পানি, সেই পানি খাল বিল পুকুরের মাধ্যমে আশপাশে কৃষি জমিতে পৌঁছে যাচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরা কয়েকশ কৃষি জমিতে এই নলকূপের পানির মাধ্যমে সেচ দিচ্ছেন। বিশেষ করে খরা মৌসুমেও এখানকার কৃষকদের পানির সংকটে পড়তে হয় না। এই নলকূপের পানির মাধ্যমে খরা মৌসুমেও তারা কৃষি কাজ করতে পারেন।
এমন একটানা পানি ঝরার পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই এখনো। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এই নিয়ে কোনো তদন্ত হয়নি। তবে এলাকাবাসীর দাবি, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।