জাতিসংঘে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে প্রস্তাব পাস

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সোজাসাপ্টা অস্বীকৃতি জানানোর এক দিনেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে বিপুল সমর্থন দিয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। শুক্রবার ‘নিউ ইয়র্ক ঘোষণা’ নামে প্রস্তাবটি ১৪২ ভোটে পাস হয়। প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দিয়েছে মাত্র ১০টি দেশ। গাজার সমর্থনে ইয়েমেনে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহর অকল্যান্ডে বিক্ষোভ করেছেন ফিলিস্তিনপন্থি হাজারো মানুষ। এদিকে, শনিবার দখলদার ইসরায়েলের বাণিজ্যিক রাজধানী তেল আবিব লক্ষ্য করে ক্লাস্টার বোমাবাহী মিসাইল নিক্ষেপ করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা।

জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের দ্বিরাষ্ট্র সমাধান বিষয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবটি বিপুল ভোটে ফিলিস্তিনের পক্ষে গেছে। ‘নিউ ইয়র্ক ঘোষণা’ নামে প্রস্তাবটি ১৪২ ভোটে পাস হয়। প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দিয়েছে মাত্র ১০টি দেশ, যার মধ্যে ইসরায়েল এবং তাদের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে। এছাড়া, ভোটদানে বিরত ছিল আরও ১২টি দেশ। প্রস্তাবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনকে ‘বাস্তবসম্মত, সময়বদ্ধ ও অপরিবর্তনীয়’ পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পথে এগোনোর আহ্বান জানানো হয়েছে। ফ্রান্স ও সৌদি আরবের উদ্যোগে উত্থাপিত সাত পৃষ্ঠার নথিতে গাজা যুদ্ধ অবসানসহ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ন্যায্য, শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধানে ‘সম্মিলিত পদক্ষেপ’ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এতে হামাসকে সব জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গাজায় শাসন বন্ধ করে ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের জন্য ‘কার্যকর পরিকল্পনা’ তৈরির সৌদি-ফরাসি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এছাড়াও, ইসরায়েলি ঔপনিবেশিক দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রক্রিয়াগুলো সক্রিয় করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ভোটের পর আগামী ২২ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে রিয়াদ ও প্যারিসের যৌথ সভাপতিত্বে জাতিসংঘের এক শীর্ষ সম্মেলন বসবে। সেখানে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁসহ একাধিক নেতা ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইতিমধ্যেই জাতিসংঘের ১৪৬ সদস্য রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। চলতি মাসের শেষ দিকে ফ্রান্স, নরওয়ে, স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যসহ আরও প্রায় ১০টি দেশ সেই তালিকায় যোগ দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এই ভোটাভুটির পর ইসরায়েল তাৎক্ষণিকভাবে ঘোষণাটিকে প্রত্যাখ্যান করে একে ‘লজ্জাজনক’ আখ্যা দিয়েছে। ভোটাভুটি এমন এক সপ্তাহে হলো, যখন ইসরায়েল গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে হামলার পাশাপাশি লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া, তিউনিসিয়া ও কাতারে প্রাণঘাতী আক্রমণ চালায়। এসব হামলা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, গাজা শহর দখলের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ সপ্তাহে তারা পাঁচ দফা বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে ৫০০টিরও বেশি স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। সেনাদের ভাষ্য, হামাসের অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার গতি আরও তীব্র করা হবে।

এদিকে, ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ইয়েমেন থেকে ক্লাস্টার বোমাবাহী মিসাইল নিক্ষেপ করেছে হুতি বিদ্রোহীরা। গতকাল শনিবার মধ্যরাতে এ মিসাইল ছোড়া হয়। আঘাত হানার আগে মিসাইলটি ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। তবে মিসাইলটিতে ক্লাস্টার বোমা থাকার ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি ইসরায়েলি বাহিনী। সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, মিসাইল হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি। তারা বলেছে, রাত ৩টা ৪৫ মিনিটের দিকে তেলআবিব ও আশপাশের অঞ্চলে আসন্ন মিসাইল হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। ওই সময় ইসরায়েলিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গত কয়েকদিনে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্লাস্টার বোমাবাহী মিসাইল ছুড়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। এছাড়া ড্রোন দিয়েও হামলা চালিয়েছে তারা। এর মধ্যে গত সপ্তাহে একটি ড্রোন ইসরায়েলি বিমানবন্দরে আঘাত হানে।

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ

গাজায় চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে সাপ্তাহিক কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় শুক্রবার ইয়েমেন জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। দেশটির রাজধানী সানার সাবিইন চত্বরে সবচেয়ে বেশি মানুষের জমায়েত দেখা যায়। এই সপ্তাহে মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের হাতের প্ল্যাকার্ডে কিছু লেখার মধ্যে ছিল ‘শহীদদের প্রতি অঙ্গীকার, কোনো কিছুর বিনিময়েই গাজার প্রতি সমর্থন থেকে পিছু হটব না।’ বিক্ষোভের আয়োজকদের তরফ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্বে যে কোনো অংশে মুসলিম উম্মাহর ওপর আগ্রাসন মানে হচ্ছে সবার ওপর হামলা। যে কোনো দেশের আত্মোৎসর্গকারী আমাদের শহীদ। পাশাপাশি কাতারের দোহায় হামাস নেতাদের ওপর সংঘটিত ইসরায়েলি হামলা ও কাতারের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানানো হয়েছে ওই বিবৃতিতে।

ফিলিস্তিনের পক্ষে বিক্ষোভ হয়েছে নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহর অকল্যান্ডে। শনিবার সকালে অকল্যান্ডের কেন্দ্রস্থলে ‘মার্চ ফর হিউম্যানিটি’ শীর্ষক সমাবেশটির আয়োজন করা হয়। সেখান হাজারো মানুষ ফিলিস্তিনকে সমর্থন জানিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। আয়োজকরা বলছেন, গাজায় ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটি এ ধরনের সবচেয়ে বড় সমাবেশ। ‘আওতেরোয়া ফর প্যালেস্টাইন’ নামের একটি সংগঠন এটি আয়োজন করে। তারা বলছে, প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।