ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইসরায়েল সফরে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। গত শনিবার ইসরায়েলের উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়েন তিনি। কাতারে হামাস নেতাদের ওপর ইসরায়েলের হামলা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনার মধ্যেই এই সফর করছেন রুবিও। এদিকে, কাতারে অবস্থানরত হামাসের শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দেওয়া গেলে গাজার সব জিম্মি মুক্তি ও যুদ্ধ শেষ করার পথে প্রধান বাধা দূর হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গত শনিবার তিনি এ মন্তব্য করেন। ইসরায়েল সম্প্রতি কাতারের রাজধানী দোহায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কাতার। দেশটি গাজা যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। এদিকে, ফিলিস্তিনের গাজা সিটিতে হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। তারা সেখানে জাতিসংঘের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত স্কুলসহ অনেক ভবন গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। গাজা সিটিতে গতকাল রবিবার ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় কমপক্ষে ৪৮ জন নিহত হয়েছেন।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে বিমানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রুবিও। তিনি আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন যে, কাতারে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সন্তুষ্ট নন। রুবিও বলেন, তবে এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রভাবিত হবে না। কিন্তু এই হামলা গাজার জিম্মিদের পুনরুদ্ধারে ট্রাম্পের আকাক্সক্ষাকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে, সে বিষয়ে ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি। কীভাবে গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটানো যেতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা করবেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা তাদের সঙ্গে দেখা করব। ভবিষ্যতে কি হবে, তা নিয়ে কথা বলব। এখনো ৪৮ জন জিম্মি আছেন। অবিলম্বে তাদের সবাইকে মুক্ত করা দরকার। রুবিও বলেন, গাজাকে এমনভাবে পুনর্নির্মাণ করতে হবে, যাতে নিজেদের প্রত্যাশামাফিক মানসম্মত জীবনযাপন করতে পারেন সেখানকার বাসিন্দারা। ইসরায়েল সফরের পর রুবিও আগামী সপ্তাহে ট্রাম্পের পরিকল্পিত ব্রিটেন সফরে যোগ দেবেন।
ইসরায়েল প্রায় দুই বছর ধরে ফিলিস্তিনের গাজায় হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৬৪ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। যুদ্ধের কারণে সেখানে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরায়েলের ১ হাজার ২০০ নিহত হন। হামাস ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায়। হামাসের কাছে এখনো ৪৮ জন জিম্মি আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে এসব জিম্মিকে মুক্ত করার পাশাপাশি গাজা যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অনেক দিন ধরে কাজ করছে কাতার। গত মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় বিমান হামলা চালিয়ে হামাসের রাজনৈতিক নেতাদের হত্যার চেষ্টা করে ইসরায়েল।
এদিকে, কাতারে থাকা হামাস নেতারাই যুদ্ধবিরতির পথে প্রধান বাধা, বলে মন্তব্য করেছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে নেতানিয়াহু লেখেন, কাতারে থাকা হামাসের সন্ত্রাসী নেতারা গাজার জনগণের প্রতি কোনো তোয়াক্কা করেন না। তারা সব যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা আটকে দিয়েছেন; যেন যুদ্ধকে অনন্তকাল টেনে নেওয়া যায়। হামাস জানিয়েছে, এ হামলায় তাদের পাঁচ সদস্য নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন নির্বাসিত গাজা নেতা খালিল আল-হায়ার ছেলে। তবে হামাসের শীর্ষ নেতৃত্ব ও আলোচক দলের সদস্যরা বেঁচে গেছেন। কাতার বলেছে, তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্যও নিহত হয়েছেন। হামাসের অভিযোগ, দোহায় হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি আলোচনা ভেস্তে দিতে চাইছে ইসরায়েল। তবে এতে গাজা যুদ্ধ শেষ করার শর্তে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
তবে ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনের গাজা সিটিতে হামলা জোরদার করেছে। ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান প্যালেস্টিনিয়ান সিভিল ডিফেন্স বলেছে, অবিরাম বোমা হামলা ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গাজা সিটির ছয় হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, গাজা সিটির মানুষ এখন চলমান অবরোধ ও হামলার মধ্যে খুবই কঠিন পরিস্থিতিতে জীবনযাপন করছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, গাজা সিটি দখলের জন্য ইসরায়েলি বাহিনী ক্রমাগত শহরটিতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গাজা সিটি থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ বলেন, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো ১০ থেকে ১৫ মিনিট অন্তর আবাসিক ভবনসহ সরকারি স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালাচ্ছে। অনেক সময় সাধারণ মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার মতো যথেষ্ট সময় পাচ্ছে না। গতকাল রবিবার ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় উপত্যকাটিতে কমপক্ষে ৪৮ জন নিহত হয়েছেন।