নবীজির প্রশংসায় রচিত গান-কবিতাকে নাত বলে। এটি ইসলামি সাহিত্যের একটি বিশেষ ধারা, যেখানে নবীজি (সা.)-এর গুণাবলির বর্ণনা এবং তার প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়। যুগে যুগে নবীপ্রেমীরা নাত লিখেছেন, গেয়েছেন, যা শুনে মানুষ মুগ্ধ হয়েছে। আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও নাতে রাসুলের একটি সমৃদ্ধ ধারা রয়েছে, যা নবীপ্রেমীদের দারুণভাবে উজ্জীবিত করে। এ ধারায় লুৎফর হাসান অন্যতম। তিনি নবীজিকে নিয়ে লিখেছেন ৭০টি নাত।
বাংলাদেশে নবীজিকে নিয়ে এককভাবে ৭০টি নাত লিখেছেন এমন লেখকের সংখ্যা খুবই কম। তবু লুৎফর হাসানের কাছে ৭০ সংখ্যাটিও খুব বেশি নয়। তিনি মনে করেন, এ সংখ্যা ৫ শতাধিক হওয়া উচিত ছিল। কেননা সার্বিকভাবে শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তার যে ব্যাপক কাজ সেগুলোর তুলনায় ৭০টি নাতে রাসুল খুবই কম। তিনি স্বপ্ন দেখেন নবীজিকে নিয়ে শত শত নাত লেখার। এটা নবীজির প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। তার নাত লেখার হাতেখড়ি বাল্যকালের উচ্ছল দিনগুলোতে। এখনো নবীজিকে নিয়ে লিখতে বসলে পূর্ণ নাত হয়ে যায়।
টাঙ্গাইল গোপালপুরের নবগ্রামে ঝিনাই নদীর অববাহিকায় বেড়ে উঠেছেন দুরন্ত ছেলে লুৎফর হাসান। ঝাঁকড়া চুলের প্রচণ্ড মেধাবী ও কল্পনাপ্রবণ এই ছেলে শৈশব কৈশোরে ছিলেন অদম্য প্রাণচঞ্চল ও দুর্বার ছটফটে। যেন কাজী নজরুলের প্রচ্ছন্ন প্রতিচ্ছবি। সেই দিনগুলোতে বাবার কঠিন শাসন, তার চেয়েও বেশি আদর এবং বিদ্যাবতী মায়ের অপাত্য স্নেহ-মায়ায় আচ্ছন্ন ছিলেন তিনি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার দিনগুলোতেই ছড়া-কবিতার ছন্দে গভীরভাবে মোহিত হন। হৃদয়ে শুরু হয় তুমুল আলোড়ন। ছন্দে ছন্দে লিখতে ও বলতে শুরু করেন। মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর ইসলামি গান রচনায় বাজিমাত করেন। পরবর্তী সময়ে সেসব গান দেশব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। হামদ-নাতসহ তিনি লিখেছেন দেড় শতাধিক ইসলামি গান।
মাদ্রাসার অনুষ্ঠান, ইসলামি মাহফিল, ইসালে সওয়াব এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তিনি নিজের লেখা ও সুর করা হামদ-নাত পরিবেশন করতেন। দিল উজাড় করে গলা ছেড়ে গাইতেন। দর্শক-শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতেন। নব্বইয়ের দশকে মাদ্রাসায় পড়ার শুরুর দিকে তার রচিত একাধিক ইসলামি গান আজও দেশব্যাপী তুমুল জনপ্রিয়।
তার লেখা নাতে রাসুলের মধ্যে অন্যতম একটি হলো, ওগো নবী দোজাহানে সবার সেরা তুমি/ কল্পলোকে সারাক্ষণই খুঁজি তোমায় আমি/ ঐ আকাশের চন্দ্র তারা ঐ আকাশের রবি/ আঁখি মেলে চেয়ে দেখে শুধুই তোমার ছবি/ তোমার সুখে হাসে আমার জীবন সুখের পাখি/ তোমার দুখে কাঁদে আমার অশ্রু ভরা আঁখি।
অপর এক নাতে রাসুল হলো, দূর আরবে হাসল যেদিন বেহেশতি এক ফুল/ ছুটল নদী সুখেরই ধারায় গাইল পাখি বুলবুল/ সেই নদী ফুল পাখি তামাম জাহান/ গাইল কোরাস সুরে তার জয়গান/ বালাগাল উলা বিকামালিহি/ কাশাফাদ্দোজা বিজামালিহি/ হাসুনাত জামিয়ু খিসোলিহি/ সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।
শেষের চার লাইন বিখ্যাত কবি শেখ সাদি (রহ.)-এর লেখা শের, যা এই নাতের ব্রিজ লাইন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ হলো, ‘তিনি (নবীজি) পূর্ণতার মাধ্যমে সর্বোচ্চ মর্যাদায় পৌঁছেছেন। তার সৌন্দর্য অন্ধকার দূর করেছে। তার সব গুণই অতুলনীয়। তার ও তার পরিবারের প্রতি দরুদ পাঠ করো।’
এই শের লেখার পেছনে চমৎকার এক ঘটনা আছে। একদা শেখ সাদি (রহ.) নবীজির সৌন্দর্য, পূর্ণতা ও গুণাবলি নিয়ে শের লিখতে শুরু করেন। তখন তার অনুভূতি এত প্রবল হয়ে ওঠে যে, কলম থেমে যায়, ভাষা হারিয়ে যায়। তিনি ভাবেন, নবীজির সৌন্দর্য, মহিমা ও পূর্ণতা তো এত অল্প শব্দে বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত আছে, এমন অসহায় অনুভূতি নিয়ে তিনি প্রথম তিন লাইন লিখেন। এরপর ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে যান। ঘুমিয়ে স্বপ্নে দেখেন নবীজিকে। নবীজি তার প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বলেন, পরের লাইন লিখো, ‘সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি’ অর্থাৎ তার ও তার পরিবারের প্রতি দরুদ পাঠ করো। অতঃপর তিনি জাগ্রত হয়ে এই লাইন লিখে ফেলেন।
নবীজিকে নিয়ে যুগে যুগে অগণিত কবি-লেখক অসংখ্য নাত-কবিতা লিখে, গেয়ে তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। সেগুলোর মধ্যে নবীযুগের ‘তলাআল বাদরু আলাইনা’ সবচেয়ে বেশি গাওয়া হয়েছে। এই নাতের কথা ও সুর নবীপ্রেমীদের আজও দারুণভাবে মুগ্ধ করে। নবীজি (সা.) যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন তখন মদিনার মানুষ সম্মিলিত কণ্ঠে এই নাত গেয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানান। প্রথম কয়েকটি লাইন হলো, তলাআল বাদরু আলাইনা/ মিন ছানিইয়্যাতিল ওয়াদা’/ ওজাবাশ শুকরু আলাইনা/ মা দাআ লিল্লাহি দা’। অর্থাৎ পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে আমাদের ওপর, ওয়াদা উপত্যকা থেকে। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য, যতদিন আল্লাহকে ডাকার মতো কেউ থাকবে।
লুৎফর হাসানের লেখা আরো কয়েকটি জনপ্রিয় নাতে রাসুল হলো, ‘কামলিওয়ালা’, ‘দরুদ পড়ি’, ‘মরুর বুকে’, ‘দূর মদিনায়’ এবং অন্যান্য। তার লেখা একটি ইসলামি জাগরণী সংগীত এত অধিক মানুষ গেয়েছেন, যা নজিরবিহীন। এমন ইসলামি মাহফিল বা ইসলামি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কমই আছে যেখানে তার সেই জাগরণী সংগীত গাওয়া হয় না। সেই সংগীতটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ইমানি চেতনাকে নতুনভাবে জাগ্রত করে।
সেই জাগরণী সংগীতটি হলো, আজকাল পরশু হোক আসবেরে বিজয় একদিন আসবেরে বিজয়/ কালেমার সঙ্গিন হাতে নিয়ে/ বাধার সাগর পাড়ি দিয়ে/ জালিমের প্রাসাদ বাতিলের দুর্গ/ করব করব করব ক্ষয়/ আজ কাল পরশু হোক আসবেরে বিজয়।