বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীরা অভিশপ্ত

আল্লাহ মানবজাতিকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য। মানুষের জীবনে ন্যায়, সত্য ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করাই ইসলামের মূল লক্ষ্য। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যুগে যুগে এমন কিছু মানুষ আবির্ভূত হয়েছে, যারা শান্তির বদলে অশান্তি, শৃঙ্খলার পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। তারা কখনো অস্ত্রের জোরে, কখনো প্রতারণা, কূটচাল বা বাকপটুতা দিয়ে মানবসমাজে ফ্যাসাদের আগুন জ¦ালিয়ে দিয়েছে। তাদের আসল চেহারা অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে ধরা পড়ে না। তারা মুখে মিষ্টি কথা বলে, বাহ্যিকভাবে ধার্মিকতা বা সহানুভূতির পরিচয় দেয়, অথচ অন্তরে লুকিয়ে রাখে হিংসা, বিদ্বেষ ও ষড়যন্ত্রের বীজ।

কোরআনে মজলুমদের পক্ষে এবং অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য ঘোষণা এসেছে। আল্লাহতায়ালা সুরা রাদের ২৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন, যারা জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায় তারা অভিশপ্ত। এ আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ফ্যাসাদ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কাজ ইসলামে এক ভয়ংকর অপরাধ। কারণ এ ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং গোটা সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়, মানুষকে একে অপরের শত্রুতে পরিণত করে এবং আল্লাহর রহমতকে দূরে সরিয়ে দেয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তার জীবনদর্শন ও বাণীর মাধ্যমে সতর্ক করেছেন, মানুষের ক্ষতি করা, বিবাদ সৃষ্টি করা বা নিরপরাধ কাউকে হত্যা করা কেবল দুনিয়ার ক্ষেত্রেই অপরাধ নয়, বরং আখেরাতেও এর ভয়ংকর শাস্তি রয়েছে। তাই একজন প্রকৃত মুমিন কখনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে না। সে সর্বদা শান্তির দূত, মানবকল্যাণের সহযাত্রী এবং সমাজে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত হয়।

বর্তমান বিশ্বে আমরা দেখতে পাই, নানা অজুহাতে, বিভিন্ন স্বার্থে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা অর্থলোভে মানুষ মানুষকে হত্যা করছে, সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। অথচ এসব কাজ ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্যতম অপরাধ এবং অভিশপ্ত কর্ম। তাই এ বিষয়টি উপলব্ধি করা এবং সমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব।

কপট শ্রেণির কিছু লোক আছে, যারা মানুষে মানুষে ঝগড়া সৃষ্টি করে নিজেদের ফায়দা লোটে। সব মহলে ভালো সেজে সবসময় উপকারভোগী হয়। পবিত্র কোরআনে এসব দুষ্টলোকের ব্যাপারে মুসলমানদের সতর্ক করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের মধ্যে এমন আছে, পার্থিব জীবন সম্পর্কিত যার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করে, আর সে ব্যক্তি তার অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহকে সাক্ষী রাখে অথচ সে ব্যক্তি খুবই ঝগড়াটে। আর যখন সে ফিরে যায়, তখন জমিনে প্রচেষ্টা চালায় তাতে ফ্যাসাদ করতে এবং ধ্বংস করতে শস্য ও প্রাণী। আর আল্লাহ ফ্যাসাদ ভালোবাসেন না। আর যখন তাকে বলা হয়, আল্লাহকে ভয় করো, তখন আত্মাভিমান তাকে পাপ করতে উৎসাহ দেয়। সুতরাং জাহান্নাম তার জন্য যথেষ্ট এবং তা কতই না মন্দ ঠিকানা।’ (সুরা বাকারা ২০১৪-২০৬)

তাফসিরবিদদের মতে, এই আয়াতে মুনাফিকের আচরণ সম্পর্কে মুমিনদের সতর্ক করা হয়েছে। মহানবী (সা.)-এর সময়ে আখনাস ইবনে শুরাইক নামক এক ব্যক্তি অত্যন্ত বাকপটু ছিল। সে মহানবী (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে কসম খেয়ে নিজেকে মুসলমান বলে প্রকাশ করত, কিন্তু দরবার থেকে উঠে গিয়েই নানা রকম বিবাদ, অন্যায়-অনাচার এবং আল্লাহর বান্দাদের কষ্ট দেওয়ার কাজে আত্মনিয়োগ করত। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন)

এই কাজগুলো করত মূলত বাকপটুতা, কূটবুদ্ধির মাধ্যমে। আবার কিছু লোক পেশিশক্তির মাধ্যমে দুনিয়ায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। পবিত্র কোরআনে তাদের ব্যাপারেও সতর্ক করা হয়েছে এবং তাদের শেষ পরিণতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণœ রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য আছে অভিসম্পাত এবং আছে মন্দ আবাস।’ (সুরা রাদ ২৫)

পবিত্র কোরআনে কোনো নিরপরাধ মানুষ হত্যা করাকে গোটা মানবতাকে হত্যার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘এ কারণেই আমি বনি ইসরাইলের ওপর এই আদেশ দিলাম, যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করা কিংবা জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা ছাড়া যে কাউকে হত্যা করল, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করল। আর যে তাকে বাঁচাল, সে যেন সব মানুষকে বাঁচাল। আর অবশ্যই তাদের নিকট আমার রাসুলগণ সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে এসেছে। তা সত্ত্বেও এরপর জমিনে তাদের অনেকে অবশ্যই সীমা লঙ্ঘনকারী।’ (সুরা মায়েদা ৩২)

মুমিনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য হলো শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্যরা নিরাপদ থাকে। এ শিক্ষা আমাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, যারা সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও ফ্যাসাদের পথে চলে তারা মুসলমানের চরিত্র বহন করছে না। বরং তারা মানবতার শত্রু, সমাজের কলঙ্ক এবং আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত।

আজকের বিশ্বে যখন অশান্তি, বিভেদ ও সহিংসতা প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে, তখন ইসলামের এই চিরন্তন বাণী আমাদের কাছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কেবল নামাজ-রোজা করলেই একজন মানুষ পূর্ণ মুমিন হতে পারে না, বরং তার আচরণ, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং শান্তিপ্রিয়তা দিয়েই প্রকৃত মুমিন হিসেবে পরিচয় পায়। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত নিজের ভেতর থেকে বিদ্বেষ, হিংসা, কূটবুদ্ধি ও অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রবণতা দূর করা।

মহান আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে ফাসাদ থেকে দূরে থাকার  তৌফিক দান করুন এবং শান্তির পথে চলতে সহায়তা করুন। সমাজে যাতে কেউ বিশৃঙ্খলার বীজ বপন করতে না পারে, সে জন্য আল্লাহর নির্দেশনা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা অনুসরণ করাই আমাদের জন্য একমাত্র সঠিক পথ। এভাবেই আমরা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গায় শান্তি ও সফলতা লাভ করতে পারব।

লেখক : ইমাম ও খতিব, চাঁদপুর