গাজায় গণহত্যা, মার্কিন সিনেটরের কড়া নিন্দা

ইসরায়েল গাজায় ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ইসরায়েলের বর্বরতা বন্ধে মার্কিন সরকারের ‘সহযোগিতা’ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

স্যান্ডার্সের এই মন্তব্য এমন সময় এলো, যখন একদিন আগেই জাতিসংঘ কমিশন অব ইনকোয়ারির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে।

স্যান্ডার্স তার বক্তব্যে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের গাজা ধ্বংসের আহ্বান, ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর সংখ্যা এবং সেখানে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘উদ্দেশ্য পরিষ্কার, সিদ্ধান্ত অপরিবর্তনীয়: ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে।’

গণতন্ত্রপন্থী এই প্রগতিশীল নেতা প্রথম মার্কিন সিনেটর হিসেবে ইসরায়েলের হামলাকে ‘গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন। এর আগে প্রতিনিধি পরিষদের কয়েকজন সদস্য একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন।

জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, গোষ্ঠীগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত যেকোনো কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অভিযোগের মাধ্যমে ইসরায়েল কেবল যুদ্ধ আইন লঙ্ঘন করছে তা নয়, বরং তারা আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর একটি, অর্থাৎ ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করছে।

স্যান্ডার্সের মন্তব্যের পরপরই রেবেকা বালিন্ট নামের আরেক মার্কিন প্রতিনিধি, যিনি নিজেও ইহুদি এবং ভারমন্ট রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন, তিনিও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় ‘গণহত্যা’র অভিযোগ আনেন। একটি নিবন্ধে বালিন্ট বলেন, ‘যখন আমি এটি লিখছি, তখন শিশুরা ক্ষুধায় ভুগছে। অথচ ইসরায়েলের চরমপন্থী সরকার ত্রাণ আটকে রেখেছে এবং বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা চালাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ভোগ শুধু যুদ্ধের কারণে মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুতে সীমাবদ্ধ নয়; এই মুহূর্তে নেতানিয়াহুর সরকারের কর্মকাণ্ড ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর একটি পদ্ধতিগত ও ইচ্ছাকৃত ধ্বংসযজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে।’

বালিন্ট বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নয় নেতানিয়াহুর গণহত্যা চালানো সরকারকে শত শত কোটি ডলার ও অস্ত্র সহায়তা দেওয়া।’

তিনি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান, যা জাতিসংঘের মাধ্যমে ব্যাপক মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করবে এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপ নেবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, গাজায় যে নৃশংসতা চলছে, তা কেবল ওই অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ‘এখন আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, বিশ্বকে বর্বরতার হাত থেকে রক্ষা করা, যেখানে মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধগুলো কোনো ধরনের শাস্তি ছাড়াই চলতে পারে।’

জাতিসংঘ কমিশন অব ইনকোয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইসরায়েলি সরকারের নির্দেশে জাতিসংঘের গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি কনভেনশনে উল্লেখিত পাঁচটি পদ্ধতির মধ্যে চারটিই ব্যবহার করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছে, গুরুতর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করছে, তাদের ওপর এমন জীবনযাত্রার শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে যা সামগ্রিকভাবে বা আংশিকভাবে তাদের শারীরিক ধ্বংস ডেকে আনবে এবং সেই গোষ্ঠীর মধ্যে জন্ম প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে পদক্ষেপ নিচ্ছে।

এতে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে যে ফিলিস্তিনিদের একটি জাতি হিসেবে ধ্বংস করার ইসরায়েলের ‘সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য’ রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘বোমা হামলার শিকার ব্যক্তিদের ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে টার্গেট করা হয়নি। বরং ফিলিস্তিনি হিসেবে তাদের পরিচয়ের কারণে তাদের সমষ্টিগতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।’

‘২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গাজায় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যতটা সম্ভব ফিলিস্তিনিদের হত্যা করতে চেয়েছিল এবং তারা জানত যে এই ধরনের সামরিক কৌশল ব্যবহার করলে শিশুসহ বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনির মৃত্যু হবে।’

ইসরায়েল এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে এর লেখকদের বিরুদ্ধে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ হওয়ার অভিযোগ এনেছে।

এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজায় ৬৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, সেখানকার বাসিন্দাদের বারবার বাস্তুচ্যুত করেছে এবং বেশিরভাগ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।

প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট মিলিয়ে মোট ৫৩৫ জন কংগ্রেস সদস্যের মধ্যে মাত্র ২০ জনের মতো সদস্য ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

তবে, ক্যাপিটল হিলে দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েলের প্রতি যে দ্বিদলীয় সমর্থন ছিল, তাতে এখন ফাটল ধরেছে। বিশেষ করে ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়ছে।

গত জুলাইয়ে, ২৭ জন সিনেটর, যাদের অধিকাংশই ডেমোক্রেটিক দলের স্যান্ডার্সের ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের প্রস্তাবিত আইনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

গত সপ্তাহে, দুই ডেমোক্রেটিক সিনেটর ক্রিস ভ্যান হলেন ও জেফ মার্কেলির এক প্রতিবেদনেও একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। ইসরায়েল ও অধিকৃত পশ্চিম তীর সফর শেষে তারা জানান, নেতানিয়াহুর সরকার গাজার ফিলিস্তিনিদের ওপর জাতিগত নির্মূলের উদ্দেশ্যে দুর্ভিক্ষ চাপিয়ে দিয়েছে।

তারা লেখেন, ‘আমাদের সফরের প্রাপ্ত তথ্য থেকে এই অনিবার্য সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, গাজায় নেতানিয়াহু সরকারের যুদ্ধ হামাসকে লক্ষ্য করে নয়, বরং এটি ফিলিস্তিনিদের ওপর একটি সমষ্টিগত শাস্তি, যার লক্ষ্য তাদের জীবনকে অসহনীয় করে তোলা।’