ময়লা ধরা পুরনো টিভিগুলোর ছবি বিক্রির জন্য অনলাইনে দেখামাত্রই শান যোশি বুঝে গিয়েছিলেন, এগুলো তার চাই-ই চাই। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার বাসিন্দা শান, পেশায় একজন গেম ডেভেলপার ও লেখক। টিভিটি দেখামাত্র সঙ্গে সঙ্গেই দাম মিটিয়ে দিলেন দশটি ক্যাথোড-রে টিউব (সিআরটি) টিভির জন্য ২ হাজার ৫০০ ডলার। মোটা কাচের স্ক্রিনওয়ালা একেকটা বিশাল বাক্স, যেন অন্য কোনো সময় থেকে উঠে আসা স্মৃতিচিহ্ন। ওয়াইফাই? অ্যাপস? ওসব ভুলে যান। এই টিভিগুলো থেকে মেলে পুরনো দিনের সেই পরিচিত আভা আর শব্দ। তবে এগুলো সাধারণ কোনো অ্যানালগ টিভি ছিল না। এগুলো ছিল প্রফেশনাল ভিডিও মনিটর বা পিভিএম। একসময় হাসপাতালের ল্যাবে দামি যন্ত্রপাতির সঙ্গে এগুলো ব্যবহার করা হতো। সম্প্রচার সংস্থাগুলোও প্রচুর পরিমাণে এ মনিটর ব্যবহার করত। আর আজ, এই পিভিএমগুলোই কিছু রেট্রো গেমারদের স্বপ্নকে রঙিন করে তুলেছে। শান যোশি এমন এক ছোট্ট দলের অংশ, যারা এসব পুরনো মডেলের টিভি খুঁজে বেড়ান। এর ছবির মান শৈশবের স্মৃতি বা নস্টালজিয়া জাগিয়ে তোলে। তিনি বলেন, এ জগতে আপনি অন্যদের চেয়ে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন, যদি আপনার চেনাজানা লোক থাকে।
কিন্তু কেন শান যোশি এবং তার মতো মানুষরা এ প্রাচীন টিভি বাক্সগুলো পাওয়ার জন্য এত কষ্ট করেন? ক্যাথোড-রে টিউব প্রযুক্তি ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো। দশকের পর দশক ধরে এ প্রযুক্তির কল্যাণেই বিশ্ব জুড়ে পরিবারগুলো তাদের বসার ঘরে একসঙ্গে প্রিয় টিভি শো উপভোগ করত। সিআরটি কম্পিউটার মনিটর হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে, রাডারের পর্দায় বিমানের গতিপথ দেখিয়েছে এবং ডাক্তারদের রোগীর শরীরের ভেতরের খুঁটিনাটি দেখতে সাহায্য করেছে। বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি সিআরটি তৈরি ও বিক্রি হয়েছে। এ বিশাল ডিভাইসগুলোর এখনো শিল্প ও সামরিক ক্ষেত্রে ব্যবহার রয়েছে। আর আশি ও নব্বইয়ের দশকের ভিডিও গেম ভক্তরা বলেন, ওই গেমগুলো খেলার আসল মজাই হলো সিআরটি টিভিতে। এর ঝাপসা পিক্সেল আর গভীরতা ও অন্ধকারের মিশেলে থাকা গ্রাফিকসের সঙ্গেই সেসব গেম তৈরি হয়েছিল।
আগে রিসাইক্লিং কোম্পানি বা টিভি স্টুডিওর ফেলে দেওয়া সরঞ্জাম থেকে এসব মনিটর (পিভিএম) জোগাড় করা যেত। কিন্তু সেটা ছিল এক দশক আগের কথা, যখন রেট্রো গেমারদের মধ্যে এর এত কদর ছিল না। ২০২৩ সাল নাগাদ এগুলো হয়ে ওঠে সোনার হরিণ। শান এ টিভিগুলোতে ‘পোকেমন’ খেলেন বা ‘সাইনফেল্ড’-এর মতো পুরনো শো দেখেন। তার এমন বন্ধুও আছেন, যারা আধুনিক সিনেমাগুলোও এ পুরনো পর্দাতেই দেখতে ভালোবাসেন। দশ বছর আগে যে পিভিএম ৫০ ডলারে পাওয়া যেত, আজ তার দাম হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়! চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে কারিগর আর রিসেলারদের ব্যবসাও জমে উঠেছে। ভার্জিনিয়ার সিআরটি মেরামতকারী স্টিভ নাটার বলেন, এ বছরই আমি প্রায় ৬৫টি অচল টিভিকে জীবন্ত করে তুলেছি। একটি টিভি সারিয়ে তুলতে তিনি প্রায় ৬০০ ডলার পর্যন্ত নেন। একটা সময় ছিল যখন এ টিভিগুলো আবর্জনায় ফেলে দেওয়া হতো আর এখন এগুলোই হয়ে উঠেছে অমূল্য। এ টিভিগুলো শুধু গেমারদের কাছেই জনপ্রিয় নয়, এদের বাক্স-আকৃতির গড়নের জন্য এগুলো দিয়ে ‘ভিডিও ওয়াল’ তৈরি করেন শিল্পীরা। এমনকি সামরিক যানের লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থায় বা পাইলটদের হেলমেটেও আজও সিআরটি ডিসপ্লে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আসল ভক্তরা এখানেই থামেন না। তারা টিভি মডিফাই করেন ভেতরের যন্ত্রাংশে পরিবর্তন এনে ছবির মান করে তোলেন একেবারে আর্কেডের মতো ঝকঝকে। ‘দ্য সিআরটি কালেকটিভ’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপের সদস্য সংখ্যাই ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। গ্রুপের মডারেটর বায়রন ম্যাকড্যানোল্ডের মতে, এ টিভির আকর্ষণ এর ছোট ছোট খুঁটিনাটিতে। তিনি বলেন, বাটনে চাপ দিলে ‘জ্যাপ, পপ’ করে যে শব্দটা হয়, ওটাই একটা অনুভূতি! তার মতে, এটা আসলে শৈশবকে নিখুঁতভাবে ফিরে পাওয়ার এক অভিযান।