জনশ্রুতি রয়েছে ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে রাজা রঘুনাথ রায় যুদ্ধে জয়ের পর অষ্টধাতুর দুর্গা প্রতিমা স্থাপন করে সুসং রাজ্যে দুর্গাপূজার প্রচলন করেন। এরপর থেকেই প্রায় সাড়ে ৩শ বছরের বেশি সময় ধরে রীতিনীতি মেনেই সুসং দুর্গাপুরে দশভুজা বাড়ি মন্দিরে হয়ে আসছে দেবী দুর্গার আরাধনা। তাই দুর্গাপূজা যেনো নেত্রকোনার ঐতিহ্যের একটি অংশ।
এই মন্দিরের প্রতিমা তৈরি করেন শিল্পী নিরঞ্জন চন্দ্র পাল। প্রায় ৪০ বছর ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন তিনি। প্রতিবছরই তার হাতে গড়ে ওঠে বড় বেশ কয়েকটি প্রতিমা। মাটির কাজ শেষে প্রতিমার অলংকার আর শেষ মুহূর্তের কাজ গুছিয়ে নিচ্ছেন তিনি। তবে প্রতিমা তৈরির অনুষঙ্গের দামে খরচের পাল্লা বেড়েছে কমেছে আয়। এমনটাই বলছিলেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, আগে একটি প্রতিমা তৈরি করতে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হলেও এখন একটি প্রতিমার পেছনে ব্যয় হয় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত। মূলত প্রতিমার ডিজাইন আর প্রতিমাকে সাজিয়ে তুলতে এই খরচ হয় বলে জানান তিনি। তবে আগের থেকে প্রতিমা তৈরির কারিগরের সংখ্যা কমে যাওয়ায় কিছুটা বেগ করতে হচ্ছে কারিগরদের।
প্রতিমা তৈরির কারিগরদের গল্প অনেকটা নিরঞ্জনের মতই। দুর্গা প্রতিমার আয়ে সারা বছরের খোরাক মিটালেও আয় কমায় সবার কাছে চিন্তার ভাঁজ। তার উপর নতুন কারিগর আর শ্রমিকের সংকটে প্রতিমা তৈরিতেও বেড়েছে সময়। তবে শেষ মুহূর্তে প্রতিমার মাটির প্রলেপে রং তুলির আঁচড় কাটছেন শিল্পীরা। নানা রঙে রাঙিয়ে তুলছেন দেবী দুর্গা ও তার সাথীদের।
দুর্গাপূজা এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় একটি খাত। গেল বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পূজা আয়োজনে কিছুটা কমতি থাকলেও এই বছর জাঁকজমকপূর্ণ এভাবেই চলছে প্রস্তুতি। ইতিমধ্যে পূজোর প্যান্ডেলের অন্যতম অনুষঙ্গ বাঁশের হাটে বেড়েছে বেচাকেনা। কলমাকান্দার উব্দাখালী নদীর পাশের এই হাট থেকে প্রতিদিন বাঁশ যাচ্ছে আশপাশের জেলাগুলোতে। আর ডেকোরেটর ব্যবসায়ীরা গেলো বারের তুলনায় কাজ বেশি পাওয়ায় চলে শেষ মুহূর্তে তোরজোর।
এদিকে পূজার আয়োজকরা বলছেন এ বছরের জেলার দশটি উপজেলায় প্রায় ৫১৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। যা গেল বছরের তুলনায় ৪৮টি বেশি। প্রতিটি মণ্ডপে পাঁচ লাখ থেকে শুরু করে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হবে। এ হিসেবে পুরো জেলায় গড়ে খরচের হবে প্রায় ৩০ কোটি টাকার বেশি।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক লিটন চন্দ্র পণ্ডিত জানান, সারা জেলায় আনন্দ উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গা পূজা উদযাপিত হবে। তাতে কোন ধরনের বিঘ্ন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আমরা সার্বক্ষণিক প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে প্রতিটি পূজা মণ্ডপ মনিটরিং করছি। গতবারের তুলনায় এবারের পূজা আয়োজন অনেক বড় এবং পূজার সংখ্যাও বেশি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) হাফিজুল ইসলাম জানান, কিছু কিছু পূজা মণ্ডপ রয়েছে দূরবর্তী বা দুর্গম এলাকায় এই হিসেবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পূজা মণ্ডপে তালিকা আমরা পেয়েছি। এই সকল পূজা মণ্ডপে ফিক্সড নিরাপত্তার ব্যবস্থা বিধান করা হবে। আর যে সকল পূজা মণ্ডপ গুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল রয়েছে সেগুলোতে মোবাইল পেট্রোলিনের মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থাকবে। এছাড়াও পূজাকে ঘিরে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তিন স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি সাদা পোশাকেও পুলিশ মোতায়ন থাকবে।
এবার দেবী দুর্গা কৈলাস থেকে মরতে আসবেন হাতির পিঠে চড়ে আর ফিরবে দোলনায় করে। তবে দেবী দূর্গা যুগে যুগে অশুভ শক্তির বিনাশ করে সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করবেন এমনটাই বিশ্বাস ভক্তদের।