সময় বাড়ে শেষ হয় না কাজ

ভৈরব সেতু নির্মাণে ৬১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে কার্যাদেশ অনুযায়ী প্রাথমিক মেয়াদ ছিল দুই বছর। তবে তিন দফায় মেয়াদ বৃদ্ধি পেয়ে তা এখন ৬ বছরে দাঁড়িয়েছে। অথচ কাজের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ১৮ শতাংশ। একইভাবে, খুলনা মহানগরীর প্রবেশপথে গল্লামারী সেতুর নির্মাণে ৬৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্পে প্রাথমিক মেয়াদ ছিল ৯ মাস, যা তিন দফায় বেড়ে ৩ বছরে পৌঁছেছে। তবুও কাজের অগ্রগতি ৩০ শতাংশের বেশি হয়নি। এই দুই সেতুর নির্মাণকাজ প্রায় থমকে থাকায় অর্থনৈতিক, সামাজিক, উন্নয়ন ও পরিবেশগত ক্ষতির শিকার হচ্ছেন খুলনার মানুষ, যা তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ভৈরব নদ খুলনা শহরকে দীঘলিয়া, গাজীরহাট ও তেরখাদা উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এই নদের দুই তীরের মানুষের যোগাযোগ উন্নত করতে ভৈরব সেতু নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। জমি অধিগ্রহণসহ ১৩১৬.৯৬ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১০.২৫০ মিটার প্রস্থের এই সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৬১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সেতুর অবকাঠামোর জন্য ৩০২ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যার মধ্যে রয়েছে ১৩১৬.৯৬ মিটার সেতু, ১০০ মিটার স্টিল সেতু, ১৩৭৬ মিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক, ২ কিলোমিটার নতুন সড়ক, ৩৭৬০ মিটার বিভাজক, ৬০০০ বর্গমিটার রক্ষা প্রাচীর, দুটি ইন্টারসেকশন এবং টোল প্লাজা।

নির্মাণকাজের দায়িত্ব পেয়েছে করিম গ্রুপের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশনকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২২ সালের ২৫ নভেম্বর কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩০ জুন করা হয়। তবুও ধীরগতির কারণে তৃতীয় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন নির্ধারণ করা হয়েছে। তিন দফায় মেয়াদ বৃদ্ধি সত্ত্বেও কাজের অগ্রগতি মাত্র ১৮ শতাংশ।

ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক এস এম নাজমুল বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কিছু ত্রুটি থাকলেও জমি অধিগ্রহণে বিলম্বের কারণে কাজে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক বিভাগ জমি অধিগ্রহণের আগেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। দীঘলিয়া উপজেলা অংশের জমি কয়েক দফায় হস্তান্তর করা হয়েছে। শহর প্রান্তে এখনো ৪৪টি পাইলের জন্য জায়গা খালি নেই, মাত্র ১০টি পাইলের কাজ সম্ভব। এর ফলে সাব-কন্ট্রাক্টররা কাজে আগ্রহী হচ্ছেন না। এছাড়া, সংশোধিত প্রস্তাবে সেতুর স্টিল অংশ ১০০ মিটার থেকে বাড়িয়ে ১৬০ মিটার, ১৪০টি পিসি গার্ডারের পরিবর্তে স্টিল গার্ডার এবং প্রস্থ ১০.২৫০ মিটার থেকে ১৩.৩০ মিটার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাব এখনো অনুমোদিত হয়নি, ফলে কাজ প্রায় বন্ধ রয়েছে।’ তবে আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে কিছু কাজ পুনরায় শুরু হবে বলে তিনি জানান।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ জানায়, পাকিস্তান আমলে গল্লামারীতে ময়ূর নদের ওপর নির্মিত সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ২০১৩ সালে ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাশে নতুন সেতু নির্মাণ করা হয়, যা ২০১৫ সালে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়। কিন্তু মাত্র ৭ বছরে সেই সেতুও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। ফলে পুরনো দুটি সেতু ভেঙে সেখানে স্টিল অবকাঠামোর নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২০ সালের ১ জুলাই একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পের আওতায় ময়ূর নদের ওপর গল্লামারীতে দুটি নতুন সেতু নির্মাণ শুরু হয়। প্রতিটি সেতুর দৈর্ঘ্য ৬৮.৭০ মিটার, প্রস্থ ১৩.৭০ মিটার এবং নদীর পানির সীমা থেকে উচ্চতা ৫ মিটার। এছাড়া, ৭৫০ মিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ করা হবে। ২০২৩ সালের ১ অক্টোবর ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এনডিই) কার্যাদেশ পায়। ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর পুরনো সেতু ভাঙার কাজ শুরু হয় এবং নতুন সেতুর কাজ শুরু হয়। প্রাথমিক মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের ৩০ জুন, কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন করা হয়। তবুও কাজের অগ্রগতি মাত্র ৩০ শতাংশ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে ১৪ কোটি টাকা।

এনডিই’র প্রকল্প ব্যবস্থাপক অপূর্ব কুমার বিশ্বাস জানান, একটি সেতু ভেঙে দুপাশে কংক্রিটের সাব-কনস্ট্রাকশনের কাজ শেষ হয়েছে। স্টিল অবকাঠামোর নির্মাণ কারখানায় চলছে।

খুলনা সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানিমুল হক বলেন, গল্লামারী সেতুর কিছু মালামাল বিদেশ থেকে আমদানি ও দেশে প্রস্তুত করতে সময় লেগেছে। বর্তমানে বেশিরভাগ মালামাল এসে গেছে এবং চলতি বছরের মধ্যে একটি সেতুর কাজ শেষ হবে। তবে দ্বিতীয় সেতুর কাজ কবে শুরু বা শেষ হবে, তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি। ভৈরব সেতুর ক্ষেত্রে, জমি হস্তান্তরে বিলম্বসহ বিভিন্ন কারণে কাজে অগ্রগতি কম। তবে কাজে গতি ফেরাতে চেষ্টা চলছে।

খুলনার নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, গল্লামারী মহানগরীর প্রধান প্রবেশদ্বার। এই সড়ক ও সেতুকে ঘিরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বৃহৎ বাজার ও জনবসতি গড়ে উঠেছে। সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে বিভিন্ন পরিবহন ও বিপুলসংখ্যক মানুষ এই পথে চলাচল করে। কিন্তু একটি সেতু ভাঙার কারণে অন্যটির ওপর চাপ বেড়েছে, ফলে তীব্র যানজট ও দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। ভৈরব সেতুর নির্মাণকাজ থমকে থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা ও কৃষিপণ্য পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে। জনভোগান্তি কমছে না। সেতু দুটির কাজ দ্রুত শেষ করার দাবিতে আন্দোলন হলেও কাজ এগোচ্ছে না, যা খুলনার মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।