চেহারার অলঙ্কার হাসি। হাসি মানুষের অন্তরের সৌন্দর্য ও প্রশান্তির প্রতিফলন। হাসি অনেক সময় গভীর দুঃখ-কষ্টকে হালকা করে তোলে, মনের অশান্তি দূর করে, হৃদয়কে প্রফুল্ল করে। গবেষণায় প্রমাণিত, পরিমিত হাসি দেহ-মনের জন্য উপকারী এবং মানুষের মানসিক চাপ কমাতে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। প্রতিটি সভ্য সমাজেই হাসি ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। আর সবচেয়ে প্রেরণাদায়ক কথা হলো, পরিমিত ও মুচকি হাসাও ইবাদদের অন্তর্ভুক্ত।
মানুষের দৈনন্দিন জীবনে হাসির গুরুত্ব অপরিসীম। পারিবারিক সম্পর্ক থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ পর্যন্ত হাসি বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের সেতুবন্ধন রচনা করে। অপরিচিত কারও সঙ্গেও যদি হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা যায়, তবে সহজেই হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। অন্যদিকে গোমড়া মুখ, বিরূপ চেহারা কিংবা কঠোর ব্যবহার দূরত্ব ও বিভাজন তৈরি করে।
ইসলামে হাসির বিষয়টিকে এক অনন্য সৌন্দর্য হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সবসময় মুচকি হাসতেন। তিনি সাহাবিদের সঙ্গে এমনভাবে সাক্ষাৎ করতেন, যাতে প্রত্যেকেই তার উষ্ণতা ও ভালোবাসা অনুভব করত। হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও সদকার অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ এটি কেবল সামাজিক সৌজন্য নয়, বরং সওয়াবেরও কাজ। তবে ইসলামে যেমন হাসির গুরুত্ব আছে, তেমনি অতিরিক্ত হাসি ও তাচ্ছিল্যের হাসি থেকে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ অতিরিক্ত হাসি হৃদয়কে কঠোর করে দেয় এবং মানুষকে অমনোযোগী করে তোলে। আবার অন্যকে উপহাস বা হেয় করার হাসি সম্পর্ক নষ্ট করে এবং নৈতিক অধপতনের পথ খুলে দেয়।
সুতরাং হাসি শুধু আনন্দের উৎস নয়, বরং এটি নৈতিকতা, মানবিকতা ও ধর্মীয় চেতনারও প্রতিফলন। সঠিক সময়ে সঠিকভাবে হাসতে জানা মানুষকে যেমন প্রিয় করে তোলে, তেমনি আল্লাহর নিকটেও এটি গ্রহণযোগ্য হয়।
হাসির ফায়দা : প্রকারভেদে হাসির বহুমাত্রিক উপকারিতা রয়েছে। যেমন হাসি মানসিক চাপ দূর করে। ব্যথা-জ¦ালা কমায়, রাগ নিয়ন্ত্রণে আনে। রোগ প্রতিরোধ করে, অকালে বৃদ্ধ হতে দেয় না। চিন্তাভাবনাকে সতেজ ও শাণিত করে। সম্পর্কের বিকাশ ও উন্নতি করে। আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে ইতিবাচক ভাবতে শেখায়। মনে-প্রাণে নতুন শক্তির জোগান দেয়। কাজের মান ও আয়ু বাড়ায়। নরওয়েতে এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাসি মানুষকে দীর্ঘায়ু করে।
হাসির আদব : গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিটি শিশু দিনে প্রায় ১০০ বার হাসে। আর পূর্ণবয়স্ক মানুষ দৈনিক কমপক্ষে ১০ বার হাসেন। হাসি দেহ-মনের জন্য উপকারী ও জরুরি অবশ্যই, তবে হাসির কিছু আদবকেতা রয়েছে। পরিস্থিতি বুঝে হাসতে পারা বুদ্ধিমানের কাজ। যদ্দুর সম্ভব বক্র হাসি থেকে দূরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কারও বিপদ দেখে কখনো হাসতে নেই।
ইসলামের সৌন্দর্য : হাসিমুখে কথা বলা ইসলামের সৌন্দর্য। চলার পথে, কাজে-কর্মে বহু মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। একজন মুসলিম হিসেবে অন্য ভাইয়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কেমন হওয়া উচিত, তা মহানবী (সা.) শিখিয়ে গেছেন। পাশাপাশি অন্যের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এটিকে তিনি সদকা হিসেবেও ঘোষণা করেছেন। সদকা অর্থ দান, যার বিনিময়ে আল্লাহ আখেরাতে পুরস্কৃত করবেন।
এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি ভালো কাজ সদকা। আর গুরুত্বপূর্ণ একটি ভালো কাজ হলো, অন্য ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা।’ (জামে তিরমিজি ১৯৭০)
অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের সাক্ষাতে মুচকি হাসি নিয়ে আসাও একটি সদকা।’ (জামে তিরমিজি ১৯৫৬)
হাসিমুখে সাক্ষাৎ করলে যে কেউ খুশি হয়। মুখ মেঘাচ্ছন্ন করে রাখলে মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। তাই সাক্ষাতে হাসিমুখে কথা বলা ও আনন্দ দেওয়ার বিষয়টি মহান আল্লাহ বেশ পছন্দ করেন।
হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের কোনো মুসলিম ভাইকে খুশি করার জন্য এমনভাবে সাক্ষাৎ করে, যেমনটি সে নিজের জন্য পছন্দ করে। কেয়ামতের দিন (বিনিময়ে) মহান আল্লাহ তাকে খুশি করবেন।’ (তাবারানি ১১৭৮)
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সবসময় মুচকি হাসতেন। মুচকি হাসি ছিল তার চিরাচরিত ভূষণ। প্রতিটি হাদিস গ্রন্থে তার হাসির ব্যাপারে বিভিন্ন আলোচনা এসেছে।
অতিরিক্ত হাসি : ইসলামে অতিরিক্ত হাসি নিষেধ। হাসি মানুষের আবেগ-উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। ভালো লাগা ও আনন্দ বা কোনো অর্জনের পরবর্তী আবেগের স্ফুটন। কিন্তু অতিরিক্ত হাসি হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ এতে বিভিন্ন ধরনের অসুবিধা তৈরি হতে পারে।
অতিরিক্ত হাসি অনেক সময় হৃদয়কে পাষাণ্ড করে তোলে। মনোকুঞ্জ রুক্ষ করে দেয়। ফলে এতে মানুষের বিভিন্ন অপরাধে জড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক কাজ রেখে শঠতা ও নির্লিপ্ততায় আক্রান্ত হয়। তাই ইসলাম মাত্রাতিরিক্ত হাসি নিষেধ করেছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, ‘মাত্রাতিরিক্ত হেসো না, কারণ অতি হাসি আত্মাকে মৃত বানিয়ে দেয়।’ (জামে তিরমিজি ২৩০৫)
মনীষীরা বলেছেন, আত্মার মৃত্যু হলো সামগ্রিক দুষ্টের সূত্র। এ জন্য মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সাবধান! অতিরিক্ত হাসি থেকে বেঁচে থাকো। কেননা অধিক হাসি আত্মা নষ্টের কারণ।’ (সহিহুল জামে ৭৮৩৩) অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি যা জানি, তা যদি তোমরা জানতে, তাহলে কম হেসে বেশি কাঁদতে।’ (জামে তিরমিজি ২৩১২)
মিথ্যা বলে হাসানো : অনেকে মিথ্যা বলে মানুষকে আনন্দ দেন। শ্রোতার কাছে প্রিয় হতে কিংবা মনোযোগ আকর্ষণে মিথ্যার আশ্রয় নেন। এ ধরনের কাজকে হাদিসে নিন্দা করা হয়েছে। রাসুল (সা.) হাদিসে বলেছেন, ‘ধ্বংস ওই ব্যক্তির জন্য, যে কথা বলার সময় মিথ্যা বলে মানুষ হাসায়। তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস।’ (আবু দাউদ ৪৯৯০)
তাচ্ছিল্যের হাসি : তাচ্ছিল্যের হাসি নিষিদ্ধ। অবস্থাভেদে প্রয়োজনীয় কথাবার্তার ধরন, প্রকার ও বিন্যাস বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কিন্তু তাই বলে কাউকে কখনো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য নয়। কাউকে হেয়জ্ঞান করা সভ্যসমাজ বিবর্জিত অভ্যাস। তাচ্ছিল্য করা যেমন ইসলামে নিষিদ্ধ, তেমনি তাচ্ছিল্যের হাসিরও অনুমোদন নেই ইসলামে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছ এবং না কেঁদে হাসছ? তোমরা কৌতুক-উচ্ছ্বাস করছ!’ (সুরা নাজম ৫৯-৬১) রাসুল (সা.) হাদিসে বলেছেন, ‘ব্যক্তির মন্দের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার ভাইকে তাচ্ছিল্য করে।’ (সহিহ মুসলিম ২৫৬৪)
মোট কথা, হাসি একটি সাধারণ ও অতি স্বাভাবিক বিষয়। অথচ এটির বিনিময়ে আমলে মহান আল্লাহ বড় পুরস্কার দেবেন। হাসিমুখে কথা বললে মানুষ যেমন খুশি হয়, মহান আল্লাহও খুশি হন। এর বিনিময়ে কেয়ামতের দিন তিনি বান্দাকে আনন্দিত ও খুশি করবেন।
হাসি মানুষের জীবনের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলেও এর মধ্যে নিহিত আছে সুদূরপ্রসারী উপকারিতা। সামান্য একটু হাসি মানুষের দুঃখকে ভুলিয়ে দিতে পারে, সম্পর্ককে দৃঢ় করতে পারে, মনকে হালকা করতে পারে। ইসলাম এ হাসিকে শুধু সামাজিক সৌজন্য হিসেবে নয়, বরং ইবাদতের মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করেছে। তবে শর্ত হলো, তা হতে হবে পরিমিত, সৎ ও আন্তরিক। অতিরিক্ত হাসি, মিথ্যা দিয়ে হাসানো কিংবা তাচ্ছিল্যের হাসি ইসলামে নিন্দিত। তাই একজন মুসলমানের উচিত পরিমিত হাসি দিয়ে অন্যকে খুশি করা, নিজের হৃদয়কে প্রফুল্ল রাখা এবং সমাজে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করা। হাসিমুখে সাক্ষাৎ শুধু মানুষকে আনন্দিত করে না, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিও অর্জন করে এবং আখেরাতে মহান পুরস্কারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার