হিমলুং হিমাল অভিযানে দেশের দুই পর্বতারোহী

‘হিমলুং হিমাল’ নেপালের গান্ধকী প্রদেশের অন্তর্গত মানাং জেলার নার-ফু উপত্যকায় অবস্থিত একটি দুর্গম পর্বত। এটি অন্নপূর্ণা রেঞ্জের উত্তর-পূর্ব দিকে মানাসলু অঞ্চলে তিব্বত সীমান্তের কোল ঘেঁষে ৭ হাজার ১২৬ মিটার উচ্চতা নিয়ে সগর্বে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এবার এই পবর্তের চূড়ায় পা রাখার অভিযানে যাচ্ছেন বাংলাদেশের দুই পর্বতারোহী ডা. শাহ আলম সিদ্দিকী (লালন সিদ্দিকী) এবং ইঞ্জিনিয়ার সালাউদ্দীন আহামেদ। তারা আগামী ১০ অক্টোবর ২০২৫ নেপালের হিমালয় পর্বতমালার এই পর্বতটি আরোহণের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন। ইতিপূর্বে তারা দুজনই হিমালয়ের মেরা পিক-সহ একাধিক পর্বতে সফল অভিযান সম্পন্ন করেছেন। গতকাল শনিবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত জানান আয়োজকরা।

মাউন্ট হিমলুং ৮ হাজার মিটার উচ্চতার পর্বতারোহণের জন্য গেটওয়ে হিসেবে বিবেচিত এবং প্রতিবছর সারা বিশ্ব থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্বতারোহী এই পর্বতে অভিযান পরিচালনা করেন। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে জাপানের একটি পর্বতারোহী দল সর্বপ্রথম হিমলুং হিমালের চূড়ায় মানুষের পদচিহ্ন রাখেন। বাংলাদেশি পর্বতারোহীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে এ বছর বসন্তে এভারেস্ট আরোহণকারী ইকরামুল হাসান শাকিল ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে মাউন্ট হিমলুং-এ সফলভাবে আরোহণ করেন। অভিযানে অংশ নেওয়া লালন সিদ্দিকী পেশায় একজন চিকিৎসক। তিনি বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে উপজেলা পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় কাজ করছেন। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি তিনি একজন স্বনামধন্য ম্যারাথনার এবং ট্রায়াথলেট। ২০২৪ সালে তিনি থাইল্যান্ডের বাংসেনে ‘আয়রনম্যান ৭০.৩’ রেইস গৌরবের সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। তিনি ৫০ কিমি মেরিন ড্রাইভ আল্ট্রা, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ম্যারাথন-সহ অর্ধ ডজন ম্যারাথন সম্পন্নকারী দৌড়বিদ। তিনি চলতি বছরের এপ্রিলে নেপালের ৬ হাজার ৪৬১ মিটার উচ্চতার মেরা পিক আরোহণ করেন। ইতিপূর্বে তিনি ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এভারেস্ট বেইজক্যাম্প ও থ্রি পাস ট্র্যাক সম্পন্ন করেন।

আরেক সদস্য সালাউদ্দীন আহামেদ পেশায় একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি দেশ-বিদেশের অসংখ্য পাহাড়ি ট্রেইলে অভিযান পরিচালনা করেছেন। তিনি ২০২১ সালে অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্র্যাকের মাধ্যমে হিমালয়ে পদচারণা শুরু করেন। ২০২২ সালে তিনি ভারতের অত্যন্ত জনপ্রিয় মাউন্ট ইয়ানুম (৬ হাজার ১১৪ মিটার) আরোহণ করেন। অতঃপর তিনি হিমালয়ে অভিযান অব্যাহত রেখে ২০২৪ সালের অক্টোবরে সফলভাবে মেরা পিক (৬ হাজার ৪৬১ মিটার) আরোহণ করেন। তিনি একজন আপাদমস্তক পাহাড় ও প্রকৃতিপ্রেমী অভিযাত্রী। লালন সিদ্দিকী ও সালাউদ্দীন আহামেদের আসন্ন হিমলুং হিমাল অভিযানে কারিগরি ও লজিস্টিক সাপোর্ট প্রদান করবে নেপালের স্বনামধন্য এক্সপেডিশন এজেন্সি ‘৮কে এক্সপেডিশনস’।

এদিকে, প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই আটহাজারি শৃঙ্গ জয় করেছেন পর্বতারোহী ডা. বাবর আলী। পৃথিবীতে আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বত আছে মোট চৌদ্দটি। এই উচ্চতায় অক্সিজেন থাকে ভূপৃষ্ঠের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। তবে গত ২৬ সেপ্টেম্বর ভোরে কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই পৃথিবীর অষ্টম উচ্চতম পর্বত মাউন্ট মানাসলু (২৬,৭৮১ ফুট) এর চূড়া স্পর্শ করে ইতিহাস গড়েন বাবর আলী। একই দিনে চূড়া ছুঁয়েছেন আরেক বাংলাদেশি পর্বতারোহী তানভীর আহমেদ যিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই প্রথম চেষ্টাতেই আটহাজারি অভিযানে সাফল্য পেয়েছেন। শনিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহমান হলে অনুষ্ঠিত হয় অভিযান-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন ও পতাকা প্রত্যর্পণ অনুষ্ঠান। ‘মানাসলু অ্যাসেন্ট : ভার্টিক্যাল ডুয়ো’ শীর্ষক এই অভিযানের আয়োজন করে পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স।  এতে উপস্থিত ছিলেন পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ‘সামুদা’-এর চিফ বিজনেস অফিসার বিকাশ কান্তি দাস, ভিজ্যুয়াল নিটওয়্যার-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ নুর ফয়সালসহ সংশ্লিষ্টরা।