অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক রংপুর গাইবান্ধায়

রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগের সংক্রমণ নিয়ে আলোচনা চলছে প্রায় দুই মাস ধরে। সেখানে রোগটির জীবাণু প্রাণিদেহ থেকে ছড়িয়েছে মানুষের শরীরেও। এ রোগের উপসর্গ নিয়ে দুজনের মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে। গত সপ্তাহে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) পীরগাছার আটজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ওই এলাকার কিছু বাড়ির ফ্রিজে রাখা গরুর মাংসেও অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু শনাক্ত হওয়ার কথা জানায় আইইডিসিআর। তবে সে সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানায়, রোগটি রংপুর জেলার বাইরে ছড়িয়েছে এমন তথ্য তাদের কাছে নেই। তাদের সেই বক্তব্যের এক সপ্তাহেরও কম সময়ে এবার গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি গ্রামে মানুষের শরীরে রোগটির সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। সেখানে মোট ১১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এছাড়া অসংখ্য গরুর শরীরে দেখা দিয়েছে এ রোগের লক্ষণ। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।

তবে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যানথ্রাক্সের চিকিৎসা সহজলভ্য এবং এতে মৃত্যুঝুঁকি তেমন একটা নেই। তবে সংক্রমণ ঠেকাতে অসুস্থ গরু বা ছাগল জবাই বন্ধ করা নিশ্চিত করতে হবে। এমনকি অসুস্থ প্রাণী মারা গেলে ঝুঁকি এড়াতে মাটির গভীরে পুঁতে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগ গরু, ছাগল, মহিষÑ এ ধরনের প্রাণীর মধ্যে দেখা যায়। এসব পশুর মাংস স্পর্শ বা নাড়াচাড়া করার মাধ্যমেই এটি মানুষের মধ্যে ছড়ায়। বাংলাদেশের কিছু এলাকায় এর আগেও অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ২০১০ সালে অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে একটি জাতীয় সমন্বয় কমিটিও গঠন করা হয়েছিল।

গত শুক্রবার রাতে গাইবান্ধা শহরের রাবেয়া ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে এসে নতুন সাতজনের মধ্যে এই উপসর্গ ধরা পড়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মনজুরুল করিম।

রাবেয়া ক্লিনিক সূত্রে জানা গেছে, রংপুর থেকে মনজুরুল করিম প্রতি শুক্রবার গাইবান্ধায় এসে রোগী দেখেন। ওইদিন তিনি ২০-২৫ জন রোগী দেখেন। তাদের মধ্যে কিশামত গ্রামের সাতজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ শনাক্ত হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তিনি তাদের গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। তবে রাতে হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে কেউ ভর্তি হননি। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।

চিকিৎসক মনজুরুল করিম বলেন, ‘অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গরুর মাংস খেলে সাধারণত এই রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। তবে চিকিৎসায় এ রোগ সেরে যায়।’

জানা গেছে, কয়েক দিন আগে কিশামত গ্রামে স্থানীয় লোকজন একটি অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গরু জবাই করে মাংস কাটাকাটি করেন। ওই গ্রামের বাসিন্দা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাফিজার রহমান জানান, গরু কাটাকাটিতে গ্রামের ১১ জন অংশ নেন। দুই-তিন দিন পর তাদের মধ্যে চারজনের শরীরে ফোসকা পড়ে এবং মাংসে পচনের মতো উপসর্গ দেখা দেয়।

গাইবান্ধার সিভিল সার্জন রকিবুজ্জামান বলেন, ‘অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ব্যক্তিদের লক্ষণ হচ্ছে চর্মরোগ। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কারও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ ধরনের রোগী ভর্তি হয়নি।’

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র বলছে, গত সেপ্টেম্বরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী ভর্তি হয়। তবে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা যায়নি।  তবে ১১ জনের উপসর্গ দেখা গেছে। 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আলুটারী গ্রামের আবদুল রহমানের ছেলে মতিন মিয়ার একটি ষাঁড় গত বৃহস্পতিবার জ্বরে আক্রান্ত হয়। পরের দিন গরুটি আরও বেশি অসুস্থ হয়। পরে তিনি গরুটি নিজ বাড়িতে জবাই করেন। জবাইকৃত গরুর মাংস স্থানীয়দের কাছে কম মূল্যে বিক্রি করেন। জবাই কাজে সহযোগিতা করেন প্রতিবেশী রওশন মিয়া, নুর আলম, ফতু মিয়া, আবদুল গফুরসহ কয়েকজন। এর দুদিন পর তাদের শরীরে উপসর্গ দেখা দেয়।

এদিকে গত এক সপ্তাহে সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৫০টিরও বেশি গবাদিপশু মারা গেছে। এ রোগে আক্রান্ত অন্তত ১০টি অসুস্থ গবাদিপশু জবাই করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা ও জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগকে একাধিকবার বিষয়টি জানালেও তারা কর্ণপাত করেনি। জনবল সংকটের কথা বলে, খামারিদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় চিকিৎসকদের কাছে গবাদিপশু দেখাতে বলা হয়েছে।

খামারিদের অভিযোগ, গরু মারা যাচ্ছে, কিন্তু প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের কাউকে পাওয়া যায় না। অফিসে গেলে তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ নেই। তারা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইরে অপেক্ষা করে শূন্য হাতে ফিরে আসতে হচ্ছে। এই রোগ নাকি ছোঁয়াচে। তাই তারা সামনে আসেন না। এখন আমরা খামারিরা কোথায় যাব, কী করব?

খামারিরা জানান, এই রোগে আক্রান্ত হলে গবাদিপশুর জ্বর, শ্বাসকষ্ট, গায়ের লোম খাড়া হয়ে থাকে এবং শরীরে কাঁপুনি দেখা দেয়। পরে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গবাদিপশুর মৃত্যু হয়।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. রফিকুজ্জামান বলেন, এ রোগে আক্রান্ত নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। কেউ আক্রান্ত হলে চিকিৎসা নিলে সুস্থ হয়।

তিনি বলেন, এ রোগের নিয়ন্ত্রণে প্রাণিসম্পদ বিভাগকে গরু-ছাগলের প্রতিষেধক টিকা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবদুল রাজ্জাক বলেন, সচেতনতা বাড়াতে উপজেলার সব কসাই ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সভা, মাইকিং, লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে।

লোকজন সেবা পাচ্ছে না অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, উপজেলায় ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি পশু রয়েছে। ২৬ হাজার ৪০০টি অ্যানথ্রাক্স প্রতিষেধক টিকা উপজেলায় সরবরাহ করা হয়েছে। অ্যানথ্রাক্সের টিকা দেওয়া কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।