পরিবারে বরকত লাভের উপায়

পরিবারে প্রতিনিয়ত সুখ-দুঃখ ও শান্তি-অশান্তির সমন্বয় ঘটে। আত্মিক প্রশান্তি, পারস্পরিক সম্পর্ক, নৈতিক দৃঢ়তা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির সঙ্গেও পরিবার দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে থাকে। মানুষের মনে একটি স্বাভাবিক আকাক্সক্ষা থাকে, তার সংসারে যেন কল্যাণ নেমে আসে, অল্প জিনিসেই যেন তৃপ্তি ও শান্তি পাওয়া যায়। এই কল্যাণকেই ইসলামি পরিভাষায় বলা হয় বরকত। বরকত মানে কেবল সম্পদের প্রাচুর্য নয়, বরং অল্পতে সন্তুষ্টি, হৃদয়ের প্রশান্তি, জীবনের সৌন্দর্য ও সাফল্য। যে জিনিসে আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত থাকে, সেটিই বরকতের আসল রূপ।

আধুনিক জীবনের প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতায় আমরা প্রাচুর্যের পেছনে ছুটি, কিন্তু সেই প্রাচুর্য অনেক সময়েই প্রশান্তি এনে দিতে পারে না। অনেকেই অর্থ, ধন-সম্পদ, খ্যাতি ও বাহ্যিক সুখ পেলেও মনে শান্তি পান না। কারণ বরকত ছাড়া প্রাচুর্য মানুষকে তৃপ্তি দিতে পারে না। অন্যদিকে এমনও দেখা যায়, কারও জীবনে সামান্য জিনিস থাকলেও সেটি আল্লাহর রহমতে বরকতপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে পরিবারে শান্তি নেমে আসে, সম্পর্ক মজবুত হয়, মনে সুখ-আনন্দ বিরাজ করে। বরকত লাভের মূল চাবিকাঠি হলো আল্লাহভীতি ও তার ওপর নির্ভরতা।

পরিবারে বরকত লাভ করা শুধু দুনিয়ার শান্তির জন্য নয়, বরং পরকালের কল্যাণ লাভেরও একটি বড় মাধ্যম। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, কীভাবে সংসারের প্রতিটি ছোট-বড় কাজে বরকত অর্জন করা যায়। বিসমিল্লাহ বলে কাজ শুরু করা, বেশি বেশি দোয়া ও ইসতেগফার করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, দান-সদকা করা, সালামের প্রচলন করা, ফজরের পর কাজ শুরু করা, এ সবই হলো সেই সহজ ও সুন্দর আমল, যা মানুষের জীবনকে কল্যাণময় করে তোলে।

আজকের দিনে মানুষের বড় অভাব অর্থের নয়, বরং বরকতের। অর্থ বাড়লেও অনেক সময় পরিবারে অশান্তি দেখা দেয়, দুঃখ-কষ্ট লেগেই থাকে। তাই প্রয়োজন বরকতের প্রকৃত ধারণা উপলব্ধি করা এবং বরকত লাভের আমলগুলো জীবনে বাস্তবায়ন করা। কারণ বরকতই হলো সেই অনন্য সম্পদ, যা অল্পকে যথেষ্ট করে তোলে, সামান্যকে মধুর করে তোলে, দুঃখকে সহজে সহ্য করার শক্তি দেয় এবং পরিবারকে জান্নাতের এক টুকরো বাগান হিসেবে সাজিয়ে তোলে। পরিবারে বরকত লাভের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উপায় উল্লেখ করা হলো।

তাকওয়া অবলম্বন করা : তাকওয়া বলা হয় আল্লাহভীতিকে। মহান আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং তাকে ভয় করলে তিনি বান্দার প্রতি বরকত বা কল্যাণ দান করেন। কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর যদি সে জনপদের অধিবাসীরা ইমান আনত এবং খোদাভীতি অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও দুনিয়ার নেয়ামতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। ফলে তাদের কৃতকর্মের কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম।’ (সুরা আরাফ ৯৬)

বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা : হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ যখন খাবার খায় আর যদি বিসমিল্লাহ বলে (আল্লাহর নামে শুরু করে) তবে শয়তান ওই খাবারে অংশগ্রহণ করতে পারে না। যেটুকু খাবার আছে তা (পরিমাণে কম হলেও) তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। অনুরূপভাবে কেউ যদি ঘরে প্রবেশ করার সময় বিসমিল্লাহ বলে তখনো শয়তান তার সঙ্গে ঘরে ঢুকতে পারে না। এভাবে বান্দা যখন সব কাজ বিসমিল্লাহ বলে শুরু করে, তখন শয়তান সব কাজ থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে সব কাজেই বরকত লাভ করা যায়।

কোরআন চর্চা করা : কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো খুবই জরুরি। কোরআন তেলাওয়াত, অধ্যয়ন এবং কোরআন অনুযায়ী জীবন গড়া ইসলামের দাবি। যে যত বেশি কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াবে তার জন্য ততবেশি বরকত নেমে আসবে। যে ঘরে কোরআন তেলাওয়াত হবে, কোরআনের চর্চা হবে, কোরআনের ওপর আমল করা হবে, সে ঘরেই নেমে আসবে আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত ও কল্যাণ।

দান-সদকা করা : বেশি বেশি দান করা ইসলামের শিক্ষা। দান-সদকার মাধ্যমে বরকত লাভ করা যায়। অনেক হাদিসে এটি প্রমাণিত যে, দানের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা বিপদাপদ দূর করে দেন। এ কারণেই রাসুল (সা.) বলেছেন, দান করার কিছু যদি না থাকে তবে একটি খেজুর দান করার মাধ্যমে হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার চেষ্টা করো। সুতরাং দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণ লাভে পরিমাণে কম হলেও সাধ্যানুযায়ী দান করা উচিত। এর মাধ্যমে তার ওপর নেমে আসবে বরকত ও কল্যাণ।

আত্মীয়দের খোঁজ নেওয়া : আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে বরকত ও কল্যাণ লাভ করা যায়। এটি অনেক পরীক্ষিত একটি আমল। আত্মীয়স্বজন তথা মা-বাবা, ভাই-বোন তথা রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা। আত্মীয়দের কেউ খারাপ আচরণ করলেও তাদের সঙ্গে নিজ থেকে সুসম্পর্ক রাখা। প্রয়োজনে সাধ্যানুযায়ী তাদের সাহায্য করা। সাহায্য করতে না পারলে তাদের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করা। আর এর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে নেমে আসবে বরকত ও কল্যাণ।

ভোরে কাজ আরম্ভ করা : দিনের শুরুতে কাজ আরম্ভ করা। যদি কারও অফিস বা ব্যবসার কাজ একটু দেরিতে শুরু হয় তবে নিজ ঘরের কাজ দিয়ে হলেও সকাল সকাল কাজ আরম্ভ করা। কেননা সকাল বেলার কাজে আল্লাহতায়ালা বরকত দান করেন। রাসুল (সা.) মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতকে সকালবেলায় বরকত দান করুন।’ সুতরাং কেউ যদি সকালের সময়টুকু ঘুমিয়ে থাকে তবে কীভাবে বরকত আসবে? এ কারণেই দিনের শুরুতে মহান আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ আরম্ভ করার মাধ্যমে বরকত ও কল্যাণ করা জরুরি।

নামাজ আদায় করা : দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। নামাজ নিজে যেমন আদায় করতে হবে তেমনি পরিবারের অন্য লোকদের নামাজ আদায়ের ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে। তাদের নামাজের নির্দেশ দিতে হবে। কেননা এমন অনেকেই আছেন যে, নিজে নিয়মিত নামাজ পড়েন ঠিকই কিন্তু পরিবারের সদস্যদের নামাজের ব্যাপারে কোনো খোঁজ রাখেন না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনি আপনার পরিবারের লোকদের নামাজের আদেশ দিন এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকুন।’

(সুরা তাহা ১৩২)

আল্লাহর ওপর ভরসা করা : বরকত লাভের অন্যতম আমল হলো আল্লাহর ওপর ভরসা করা। মুমিন যত বেশি আল্লাহর ওপর ভরসা করবে আল্লাহ ততবেশি তাকে সাহায্য করবেন। পক্ষান্তরে আল্লাহর প্রতি আস্থা, নির্ভরতা বা ভরসা যতি বেশি কমবে, সে ততবেশি অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে। বিপদে অনেকেই আল্লাহর প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন। অনেক সময় আল্লাহর প্রতি নানা মন্তব্যও শুরু করেন। তা কোনোভাবেই ঠিক নয়।

ক্ষমা প্রার্থনা করা : জীবনে বরকত লাভের অন্যতম আমল হলো বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করা। এর কোনো হিসাব, সংখ্যা বা সময় নির্ধারণ করে করা যাবে না। বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই ক্ষমা প্রার্থনা করা কাম্য। পুরো ইসতেগফার বলতে না পারলে অন্তত এটুকু বলা ‘আসতাগফিরুল্লাহ’। ইসতেগফার পড়ার সময় এ বিষয়টি মনে অনুভব করা যে, সব অন্যায়-অপরাধ থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

সালামের প্রচলন করা : সালামের ব্যাপক প্রচলন করা বরকত লাভের অন্যতম মাধ্যম। সালামের পুরোটাই হলো শান্তি, রহমত ও বরকতের দোয়া। জীবনে বরকত লাভের সহজ ও প্রচলিত এ আমলগুলোর প্রতি একটু খেয়াল রাখলেই বা যত্নবান হলেই জীবনে নেমে আসবে অবিরত রহমত ও বরকত। মহান আল্লাহ আমাদের সহজ এই আমলগুলো বেশি বেশি করার তওফিক দান করুন। আমরা যেন এই আমলগুলো নিয়মিত করা মাধ্যমে তার সন্তুষ্টি লাভ করতে পারি এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সীমাহীন কল্যাণ অর্জন করতে পারি। আমিন।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার