বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার পূর্বাঞ্চলীয় দ্রিনজাকা উপত্যকার কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৬০০ বছরের পুরনো এক ঐতিহাসিক নিদর্শন। নাম কুসলাত মসজিদ। ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং মানুষের অটুট বিশ্বাসের এক অনন্য প্রতীক এই পাহাড় চূড়ার মসজিদ। স্থানীয়রা এটাকে বলেন ‘আকাশের মসজিদ’।
দ্রিনজাকা নদীর গর্জনময় গিরিখাতের ওপর ৫০০ মিটার উঁচুতে সবুজে মোড়া পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি যেন আকাশ আর মাটির মাঝখানে ঝুলে আছে। পৌঁছানো যায় কেবল সরু বনপথ পেরিয়ে। যে কেউ কষ্ট করে এই পথ বেয়ে ওপরে ওঠেন, তিনি পুরস্কার পান মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের। দূরে ছড়িয়ে থাকা পাহাড়, উপত্যকা আর নদীর সৌন্দর্য মিলে সৃষ্টি করে এক অদ্ভুত নৈসর্গ।
পঞ্চদশ শতকে নির্মিত এই মসজিদ বসনিয়ার প্রাচীনতম ইসলামি স্থাপনাগুলোর একটি। অটোমান ভ্রমণকারী এভলিয়া চেলেবি উল্লেখ করেছেন, এটি সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহের আমলে নির্মিত। তিনি লিখেছেন, ‘মানুষ সাহস করে নিচে তাকাতে পারে না, কারণ উপত্যকায় নদীর গর্জন যেন বজ্রধ্বনির মতো শোনায়।’ তবে কুসলাত কেবল নামাজের স্থানই ছিল না। অটোমানদের আগমনেরও আগে এখানে ছিল এক দুর্গ নগরী, যা কাফেলা ও পথচারীদের নিরাপত্তা দিত। পরে মসজিদটি গড়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক এক প্রতীক হয়ে ওঠে। স্থানীয় নারীরা কখনো কখনো বাজপাখির নকশা সূচিশিল্পে ফুটিয়ে তুলতেন, যা এই মসজিদের নামের সঙ্গেই সম্পর্কিত। তুর্কি ভাষায় ‘কুস’ মানে পাখি।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই মসজিদ ঘিরে নানা ধর্মীয় অনুশীলন ও সামাজিক প্রথা গড়ে ওঠে। খরার সময় শিশু ও গ্রামবাসীকে নিয়ে আলেমরা এখানে আসতেন বৃষ্টির প্রার্থনা করতে। অনেকে বিশ্বাস করতেন, এ মসজিদের বরকতময় উচ্চভূমির অসিলায় রোগব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এ জন্য মানুষ এখানে নীরব প্রার্থনা করত, মানত করত এবং দানও করত।
যদিও আশপাশে আরও সহজগম্য মসজিদ নির্মিত হয়েছিল, তবু কুসলাত হারায়নি তার মাহাত্ম্য। এখানে অনুষ্ঠিত হতো জুমার নামাজ, ঈদের নামাজ এবং বিশেষ কিছু অনুষ্ঠান। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই ধারা অব্যাহত ছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে বসনিয়ার ভয়াবহ যুদ্ধে কুসলাত মসজিদটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় আকাশের এই মসজিদ। পরে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টায় এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে প্রামাণ্য উপকরণ ব্যবহার করে আগের স্থানেই আবার গড়ে তোলা হয়। প্রায় দুই দশক পর আনুষ্ঠানিকভাবে আবার এর দরজা খুলে দেওয়া হয়।
পুনর্নির্মাণে স্থানীয় কারিগররা পাথর ও কাঠ ব্যবহার করে ঐতিহ্য রক্ষা করেছেন। অল্প আকারের নামাজখানাটিতে মিহরাব ও মিম্বার নির্মাণে সরলতা দেখা যায়। স্থাপত্য শৈলী অটোমান চিহ্ন বহন করে। এটি শিক্ষার একটি কেন্দ্রও হয়ে ওঠে। স্থানীয়ভাবে ইসলামি সভা আয়োজন করা হয়, তরুণরা এখানে তাদের পূর্বপুরুষদের কাহিনি জানে। মসজিদটি রক্ষা ও সংরক্ষণে যে যতœ নেওয়া হয়েছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঐতিহ্যের পরিচয় দেবে। পর্যটন ও স্থানীয় জীবনের মিশ্রণে কুসলাত মসজিদ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এখানে এসে প্রতিটি দর্শক ফিরে যায় প্রশান্ত হৃদয় নিয়ে।
প্রতি বছর আগস্টের শেষ শুক্রবার এখানে অনুষ্ঠিত হয় জুমার নামাজ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পবিত্র রমজান মাসেও বিশেষ নামাজ আদায়ের আয়োজন করা হয়। ফলে কুসলাত আবার হয়ে উঠেছে মানুষের মিলনস্থল, ঐতিহ্যের ধারক এবং আধ্যাত্মিক প্রশান্তির স্থান। নোবেলজয়ী লেখক ইভো আন্দ্রিচ এক সময় বলেছিলেন, ‘কুসলাতকে না জানলে নিজেকে সত্যিকারের বসনিয়ান বলা যায় না।’ তার এ কথাই যেন প্রমাণ করে এই মসজিদের গভীর সাংস্কৃতিক ও মানসিক প্রভাব।
শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, কুসলাত মসজিদ বসনিয়ার মুসলমানদের সংগ্রাম ও পুনর্জাগরণের প্রতীক। সময়ের আঘাত, যুদ্ধের অগ্নিকুণ্ড, ধ্বংসস্তূপের ছাই, সবকিছুর মাঝেও টিকে আছে এটি। দাঁড়িয়ে আছে আকাশের সন্নিকটে, মানুষের বিশ্বাস ও ধৈর্যের অবিনাশী নিদর্শন হয়ে।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার