তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তুলি, রঙ এবং ক্যানভাসের সঙ্গে নিবিড় সংলাপে মগ্ন শিল্পী আবু সালেহ টিটুর চতুর্থ একক চিত্র প্রদর্শনী গতকাল বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে। রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এ প্রদর্শনী চলবে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত। অ্যাক্রিলিকে আঁকা ৩২টি চিত্রকর্মের এ সংকলন দর্শককে পরিচিত রূপরেখার মধ্য দিয়ে মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার এক অপরিচিত ভূখণ্ডের দিকে নিয়ে যায়।
বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত মি. হকোন অ্যারাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেছেন। সম্মানিত অতিথি হিসেবে ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পসমালোচক অধ্যাপক মইনুদ্দিন খালেদ এবং লেখক-গবেষক অধ্যাপক মোরশেদ শফিউল হাসান। প্রদর্শনী প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
চিত্রকলায় আবু সালেহ টিটুর দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ই বস্তুজগতের উপরিতল থেকে অনেক গভীরে পৌঁছায়। তিনি শুধু ‘দেখা’র শিল্পী নন; দেখা ও অনুভবের মধ্যবর্তী যে সূক্ষ্ম সংলাপ, সেটিকেই তিনি শিল্পসৃষ্টির আসল উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন। রঙ ও ফর্মের এ পারস্পরিক আলাপে টিটু গড়ে তোলেন এক স্বতন্ত্র ভাষা যেখানে দৃশ্যমান জগতের অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে রূপ নেয় মনের প্রকাশে।
শিল্পরীতির দিক থেকে টিটুর কাজের মধ্যে ইম্প্রেশনিজমের প্রবণতা স্পষ্ট, যদিও তার ভাবপ্রবণতা ও গঠনধারা অনেকাংশে বিমূর্ত শিল্পের দিকে ঝোঁকে। রঙের ভ্রাম্যমাণতা ও ফর্মের সীমানা ভাঙার প্রবণতা থাকলেও তিনি রূপের গঠনকে অবহেলা করেন না। বরং রঙ ও আকারের পারস্পরিক টানাপড়েনেই তিনি খুঁজে পান নিজের শিল্পভাষা। তার ছবিতে কখনো টলটলায়মান ফর্ম, কখনো রঙের ভাস্কর্যায়ন, আবার কখনো স্থাপত্যিক কাঠামোর ভাঙন সব মিলিয়ে টিটুর চিত্রকর্ম সময় ও মনের সংঘাতের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
আবু সালেহ টিটুর কাজের মূলে রয়েছে দৃশ্যগত পর্যবেক্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ আবেগের মেলবন্ধন। তার চিত্রকর্ম বাহ্যিক বাস্তবতার অনুলিপি তৈরি করে না; বরং রঙের মাধ্যমে নির্মাণ করে এক এমন জগৎ, যা একান্তই তার নিজস্ব অনুভূতির ফসল। এ শৈলীতে ইম্প্রেশনিজমের স্বতঃস্ফূর্ততা ও বিমূর্ততার কাঠামোগত প্রবণতা একীভূত হয়েছে এক অনন্য ভারসাম্যে।
তার শিল্পে ফরাসি চিত্রশিল্পী পল সেজানের প্রভাব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে, বিশেষ করে ফর্মের নির্মাণ ও কম্পোজিশনে। তবে সেজান যেখানে কিউবিজমের অগ্রদূত হিসেবে কঠোর জ্যামিতিক কোণ ও প্রান্ত ব্যবহার করেছিলেন, টিটু সেখানে সেই কাঠিন্য থেকে সরে এসে বেছে নিয়েছেন বক্ররেখা, প্রবাহমানতা এবং নরম ফর্মের এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে তার ছবিগুলো হয়ে ওঠে আবেগঘন, সুরেলা ও মাধুর্যপূর্ণ। ফর্ম ভাঙা এবং পুনর্গঠনের এই প্রক্রিয়া শিল্পী-মনের চিন্তা, স্মৃতি ও জীবনের ধারাবাহিক পুনর্লিখনের প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
টিটুর ক্যানভাসে রঙের ব্যবহার শক্তিশালী ও ভাববাহী। তার ছবিতে রঙের প্রাচুর্যের মাঝে, নীল রঙের প্রাধান্য বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নীল এখানে শিল্পীর মনন, বিষণœতা ও অনুভূতির পরিমণ্ডল। পাশাপাশি শ্যামল সবুজের ব্যবহার ছবিতে এনে দেয় এক ধরনের ভারসাম্য ও প্রকৃতির ইঙ্গিত।
নারীমূর্তি টিটুর কাজে একটি পুনরাবৃত্তি মোটিফ। কখনো বিমূর্ত, কখনো দৃশ্যমান ইঙ্গিতে এ নারীমূর্তিগুলো তার ক্যানভাসে ফিরে আসে জীবন, উর্বরতা, অনুভূতি এবং আত্ম-অন্বেষণের প্রতীক হিসেবে। যেন প্রতিটি নারীমূর্তির ভেতর তিনি অনুসন্ধান করেন নিজের ভেতরের সেই মানবিক কোমলতা, যা তার রঙ ও ফর্মের মতোই তরল, অথচ গভীরতর স্তরে নিবিড় ও তীক্ষè।
১৯৬৯ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলায় জন্ম নেওয়া আবু সালেহ টিটু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর নিজেকে পেশাদার চিত্রকলায় নিয়োজিত করেন। শৈশবেই সিলেট ক্যাডেট কলেজ ক্যাম্পাসে তার স্কেচ প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে শৈল্পিক আগ্রহের সূত্রপাত।
তার শিল্পজীবন দীর্ঘ ও বর্ণিল। ১৯৯৪ সালে ঢাকা শেরাটন হোটেলে প্রথম একক প্রদর্শনী, ২০০১ সালে মেইসনার গ্যালারিতে দ্বিতীয়টি এবং ২০২০ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে তৃতীয় একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। কর্মজীবনে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকে শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন এবং পরে ইউএসএআইডি, ডব্লিউএইচও, সিআইএমএমওয়াইটিসহ একাধিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার কাজ বাংলাদেশের বঙ্গভবন, সেনানিবাস, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর অফিসসহ বহু ব্যক্তিগত সংগ্রহকে অলংকৃত করেছে। ২০১৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তার একটি চিত্রকর্ম গ্রহণ করেছিলেন, যা তার কাজের গুরুত্বের প্রতীক।
আবু সালেহ টিটুর এ প্রদর্শনীটি তার তিন দশকের সাধনার এক গভীর নির্যাস, যা দর্শককে রঙ, রেখা ও ফর্মের মধ্য দিয়ে জীবন ও মনের জটিল অথচ কাব্যিক সংলাপের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ করে দেবে।