বসতঘর ঘেঁষেই ১১ কিলোভোল্ট বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের খুঁটি। খুঁটির খোলা তার টানানো হয়েছে বাড়ির ছাদের ওপর হাতছোঁয়া দূরত্বে। ছাদে কাপড় শুকাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে প্রাণ হারান আসমা আক্তার (২৫)। দুই সন্তানের জননীর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে গত ২১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের ভিংরোল গ্রামে।
গ্রামবাসী জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ খুঁটিটি সরাতে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে সাত বছর ধরে অভিযোগ জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০২৩ সালে ওই এলাকার মাস্টার আশরাফ আলী সমীক্ষা ফি জমা দিয়ে খুঁটি সরানোর জন্য আবেদন করেন। এর প্রেক্ষিতে নীতিমালা অনুযায়ী ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা ডিমান্ড চার্জ ধরা হয়। কিন্তু সে টাকা জমা না হওয়ায় খুঁটি সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে বিদ্যুৎস্পর্শে ওই গৃহবধূর মৃত্যুর পর গত ৫ অক্টোবর সেই খুঁটির খোলা তারে কভার লাগানো হয়েছে।
বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায় বিগত দিনে কত লোক মারা গেছে সে পরিসংখ্যান কোনো প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যায়নি। বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ও সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ চোখে পড়ে না। পরিসংখ্যান না থাকলেও দেশ রূপান্তরসহ মূলধারার কয়েকটি দৈনিক পত্রিকার তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এ চার মাসে বিদ্যুৎস্পর্শে দুই উপজেলায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এ ছাড়া প্রতিবছর আনোয়ারা-কর্ণফুলীতে যেসব অগ্নিকা- ঘটে তার বেশির ভাগই বৈদ্যুতিক শটসার্কিটের কারণে হয় বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
জানা গেছে, গত ৪ জুন বিকেলে কর্ণফুলী উপজেলার ফকিরনীর হাটে কোরবানির পশু দেখতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে দগ্ধ হওয়ার দুইদিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মো. রিয়াদ (১৪) নামের এক কিশোর মারা যায়। ১৪ জুন দুপুরে কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে পাকাঘরের নির্মাণ কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ফরিদুল আলম (৫৬) নামের এক নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু হয়। ২০ জুন বিকেলে আনোয়ারা উপজেলার চাতরী ইউনিয়নের ইয়াজ মোল্লার বাড়িতে ঘরের কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে শহিদুল ইসলাম (২৫) নামের এক যুবক মারা যান। ৯ জুলাই সকালে আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের বাথুয়াপাড়ায় গোয়ালঘরের মেরামত কাজ করার সময় বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে মাহমুদুল হাসান রানা (২৫) নামের এক কলেজশিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। ১৮ জুলাই দুপুরে আনোয়ারা উপজেলার জুঁইদ-ী ইউনিয়নের দক্ষিণ খুরুস্কুল গ্রামে ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুতের কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মো. ইমন (২০) নামের এক তরুণের মৃত্যু হয়। ৪ আগস্ট রাতে আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ছেঁড়া বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে প্রাণ হারায় মনির হোসেন (১৭) নামের এক কিশোর। ২১ আগস্ট বিকেলে কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ইউনিয়নের পাঠানপাড়ায় বাড়ির ছাদে খেলার সময় ৩৩ কিলোভোল্টের তারে জড়িয়ে দগ্ধ হওয়ার ৫ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মো. সিয়াম (৮) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। ২৭ আগস্ট রাতে কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের পূর্বপাড়ায় অটোরিকশায় চার্জ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে মো.আলমগীর (৩০) নামের এক যুবক মারা যান। ৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের ফকিরখীল এলাকায় হাতি তাড়ানোর বৈদ্যুতিক ফাঁদে জড়িয়ে জাহেদ খান (১৮) নামের এক তরুণের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর বিকেলে আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের ভিংরোল গ্রামে বাড়ির ছাদে কাপড় শুকাতে গিয়ে ১১ কিলোভোল্টের তারে জড়িয়ে প্রাণ হারান আসমা আক্তার (২৫) নামের এক গৃহবধূ।
আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায় বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ভুক্তভোগীরা কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি; আবেদনও করেননি। উচ্চ ভোল্টেজের প্রধান সঞ্চালন লাইনটি কর্ণফুলী থেকে আনোয়ারা উপজেলা পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার গেছে অনেক বাড়ির ওপর দিয়ে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বলছে, উচ্চ ভোল্টেজের সঞ্চালন লাইন অন্তত ৩০ বছর আগে বসানো হয়েছিল। তখন সেখানে বাড়িঘর বা কোনো অবকাঠামো ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী সঞ্চালন লাইনের ১০ ফুট দূরত্বে স্থাপনা তৈরির কথা। কিন্তু নিয়ম না মেনে অনেকেই সঞ্চালন লাইনের হাতছোঁয়া দূরত্বে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলেছে।
পল্লী বিদ্যুৎ আনোয়ারা ও কর্ণফুলী জোনাল অফিস সূত্র জানায়, আনোয়ারা উপজেলায় ৩৩ কিলোভোল্টের প্রধান সঞ্চালন লাইন ৪৭ কিলোমিটার। আর ১১ কিলোভোল্টের বিতরণ লাইন ১ হাজার ৫১ কিলোমিটার। এ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে গ্রাহকসংখ্যা ৯৩ হাজার ৫৭২। অপরদিকে কর্ণফুলী উপজেলায় ৩৩ কিলোভোল্টের প্রধান সঞ্চালন লাইন রয়েছে ৫৩ কিলোমিটার। আর ১১ কিলোভোল্টের বিতরণ লাইন ৪৩৮ কিলোমিটার। এ উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে প্রায় ৪১ হাজার গ্রাহক রয়েছে।
অনুসন্ধানে তিনটি কারণে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। কারণগুলো হচ্ছে অরক্ষিত বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন, বিদ্যুৎ বিভাগের গাফিলতি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর অসাবধানতা। অসচেতনতায় শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎস্পর্শে বেশি মানুষ মারা যায়।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের প্রধান লাইন খোলা তারে টানা। অর্থাৎ অপরিবাহী উপাদানের আচ্ছাদন ছাড়া ৩৩ থেকে ১১ কেভি বিদ্যুতের এসব অ্যালুমিনিয়ামের তার গেছে ধানক্ষেত, জনবসতি, হাট-বাজারের ওপর দিয়ে। সংশ্নিষ্টরা জানান, প্রধান লাইনের তার আচ্ছাদিত করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল বলে প্রায় সব দেশে এগুলো খোলাই থাকে। তবে সেগুলোকে ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়।
জনবসতির কাছে স্থাপিত ঝুঁকিপূর্ণ এসব লাইন থেকে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলছে, লাইন স্থাপনের সময় জনবসতি দূরেই ছিল। ক্রমান্বয়ে জনবসতি বেড়ে যাওয়ায় সমস্যা হচ্ছে। যেসব জায়গায় বেশি ঘরবাড়ির ওপর দিয়ে বিদ্যুতের লাইন গেছে, সেসব জায়গা থেকে লাইন সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাড়ি ও দোকানপাটে বিদ্যুৎ নিতে অনেক এলাকায় গাছ ও বাঁশের খুঁটি দিয়ে অস্থায়ীভাবে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা বৃষ্টিপাতে সহজেই বিদ্যুতায়িত হয়। রাস্তা, উঠান, দোকানপাটে তার ঝুঁকিপূর্ণভাবে ঝুলে থাকে। অনেক তার ছেঁড়া-ফাটা ও ত্রুটিপূর্ণ। মেরামতে গ্রাহকদের গাফিলতি রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। অনেকেই বিদ্যুৎকর্মীদের ঘুষ দিয়ে পাশের বাড়ি থেকে লাইন নেন। সাইড লাইনের সংখ্যা বাড়লেও এর বিরুদ্ধে অভিযান তেমন জোরালো নয়। সাইড লাইন বাঁশ ও গাছের খুঁটিতেও টানা হয়।
আনোয়ারা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ বলেন, ‘বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিকা-ের সূত্রপাতের বেশিরভাগই বৈদ্যুতিক শটসার্কিট থেকে। বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের অসাবধানতায়ও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। ঘরের বিদ্যুতের ওয়্যারিং যথাযথ না হওয়া, ত্রুটিপূর্ণ সংযোগ, নিয়মিত বিদ্যুৎ লাইন পরীক্ষা না করা এবং অসতর্কভাবে বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎস্পর্শে প্রাণহানি ঘটে।’
বিদ্যুৎ অফিসের কোনো গাফিলতি নেই দাবি করে পল্লী বিদ্যুৎ আনোয়ারা জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. মোর্শেদুল ইসলাম বলেন, ‘কোথাও সমস্যা থাকলে অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাধান করা হয়। কেউ যদি নিজের অসাবধানতায় দুর্ঘটনার শিকার হয় সে ক্ষেত্রে কিছু করার নেই।’
চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ১-এর সভাপতি চৌধুরী হাসান মাহমুদ বলেন, ‘বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা সতর্ক হলে দুর্ঘটনার হার কমবে এবং ঘরের ওয়্যারিংয়ের মান ও ত্রুটি সম্পর্কেও সবাইকে সজাগ হতে হবে। পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি বা সঞ্চালন লাইন যেসব স্থাপনার ওপর দিয়ে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে সেসব লাইন বা খুঁটি আবেদনের প্রেক্ষিতে নিয়ম মেনে সরানো হয়।’
চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ১-এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) প্রকৌশলী দিলীপ চন্দ্র চৌধুরী বলেন, ‘বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় হতাহত বা ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের কোনো বিধান নেই। তবে বিদ্যুৎ অফিসের গাফিলতির কারণে দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু হলে মানবিক দিক বিবেচনা করে কিছু ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়।’